কর্মক্ষেত্রে বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ২ কোটি ৯৫ লাখ ডলার দিতে রাজি লকহিড মার্টিন

শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি — যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন কর্মক্ষেত্রে বর্ণ ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে মোট প্রায় ২ কোটি ৯৫ লাখ ডলার দিতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (DOJ) এবং সমান কর্মসংস্থান সুযোগ কমিশন (EEOC) মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এ সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছে। সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার দেবে লকহিড মার্টিন। অন্যদিকে, বৈষম্যের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত এক হাজারের বেশি বর্তমান ও সাবেক কর্মীকে দেওয়া হবে ৭৫ লাখ ডলারের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বেথেসডায় প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর অবস্থিত।

বিচার বিভাগের অভিযোগ, ২০১৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ফেডারেল সরকারের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে বর্ণ ও লিঙ্গনিরপেক্ষ নিয়োগ, পদোন্নতি ও পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে এসব বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি চুক্তিতে বৈষম্যবিরোধী আইন মেনে চলার বিষয়ে মিথ্যা প্রত্যয়ন দিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের সঙ্গে সমঝোতাটি করা হয়েছে False Claims Act-এর আওতায়। এ আইনের অধীনে সরকারি চুক্তি বাস্তবায়নে মিথ্যা তথ্য বা প্রত্যয়ন দেওয়ার অভিযোগ নিষ্পত্তিতে লকহিড মার্টিন ২ কোটি ২০ লাখ ডলার দিতে রাজি হয়েছে।

সমান কর্মসংস্থান সুযোগ কমিশন এর সঙ্গে পৃথক সমঝোতার আওতায় এক হাজারের বেশি কর্মী ৭৫ লাখ ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন। ২০২৫ সালে সমান কর্মসংস্থান সুযোগ কমিশন এর চেয়ারম্যান আন্দ্রেয়া লুকাসের দায়ের করা কমিশনারস চার্জে অভিযোগ করা হয়, লকহিড মার্টিনের বিভিন্ন কর্মমূল্যায়ন, বোনাস ও অন্যান্য পারিশ্রমিক নির্ধারণে শ্বেতাঙ্গ কর্মীদের বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্য করা হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল প্রতিষ্ঠানটির ‘Compensation Adder’ বা ‘Comp Adder’ নামের একটি বেতন-প্রণোদনা কর্মসূচি। ২০২১ সাল থেকে চালু এ কর্মসূচির আওতায় প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ব্যবসায়িক বিভাগের শীর্ষ ২০ শতাংশ কর্মীকে বার্ষিক সাধারণ বেতন বৃদ্ধির অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হতো।

বিচার বিভাগের অভিযোগ, শুরুতে কর্মীদের কর্মদক্ষতা ও মেধাভিত্তিক মানদণ্ডে মনোনয়ন দেওয়া হলেও চূড়ান্ত তালিকা তৈরির আগে কর্মীদের বর্ণ ও লিঙ্গের ভিত্তিতে পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করা হতো। কোনো বিভাগে নির্দিষ্ট বর্ণ বা লিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মানবসম্পদ বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ব্যবস্থাপকদের ওপর তালিকা পরিবর্তনের চাপ সৃষ্টি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অশ্বেতাঙ্গ কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করতে শ্বেতাঙ্গ বা সংখ্যালঘু নন—এমন কর্মীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে সরকার। বিচার বিভাগের নথিতে একজন মানবসম্পদ কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, Comp Adder তালিকায় বর্ণগত সংখ্যালঘু কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হলে সমপরিমাণ অ-সংখ্যালঘু কর্মীকে বাদ দিতে হবে।

এ ছাড়া নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বর্ণ ও লিঙ্গভিত্তিক লক্ষ্য পূরণের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সরকার। প্রতিষ্ঠানটির কিছু প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ ও নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচিতে কর্মীদের বর্ণ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এই নিষ্পত্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে লকহিড মার্টিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট টিম বুহারের দায়ের করা হুইসেলব্লোয়ার মামলা। ফলস ক্লাইম্স এক্ট (False Claims Act) এর অধীনে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ বা প্রতারণার অভিযোগে কোনো ব্যক্তি সরকারের পক্ষে মামলা করতে পারেন এবং আদায় হওয়া অর্থের একটি অংশ পেতে পারেন। সমঝোতা অনুযায়ী, টিম বুহার ৪৪ লাখ ডলার পাবেন।

সমান কর্মসংস্থান সুযোগ কমিশন চেয়ারম্যান আন্দ্রেয়া লুকাস বলেন, টাইটেল ৭ সিভিল রাইটস এক্ট (Title VII of the Civil Rights Act) অনুযায়ী নিয়োগকর্তাদের প্রত্যেক কর্মীকে ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সুযোগ, পারিশ্রমিক ও পুরস্কার বর্ণ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যাবে না। তিনি বলেন, বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তির (DEI) উদ্যোগের নামে পরিচালিত বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড শনাক্ত ও প্রতিকার করা সমান কর্মসংস্থান সুযোগ কমিশন এর অন্যতম অগ্রাধিকার। এই সমঝোতার মাধ্যমে অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত এক হাজারের বেশি কর্মী উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা পাবেন।

বিচার বিভাগের কর্মকর্তারাও বলেন, সরকারি অর্থে পরিচালিত চুক্তিতে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পারিশ্রমিক নির্ধারণে বর্ণ ও লিঙ্গনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করতে হবে। সমঝোতার অংশ হিসেবে লকহিড মার্টিনকে টাইটেল ৭ (Title VII) এবং নির্বাহী আদেশ ১৪১৫১ মেনে চলতে হবে। নিয়োগ, বোনাস, পারিশ্রমিক ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বর্ণ বা লিঙ্গ নয়, বরং মেধা ও কর্মদক্ষতাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। চুক্তির মেয়াদজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির আইন মেনে চলার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে সমান কর্মসংস্থান সুযোগ কমিশন।

বিচার বিভাগ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি তদন্ত ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে। লকহিড মার্টিন আইন লঙ্ঘন করেছে—এমন কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত বা দায় নির্ধারণ করা হয়নি।