শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি — যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই নির্বাচনী পর্যবেক্ষক মোতায়েন করছে বিচার বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস—ডিওজে)। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটাধিকার সুরক্ষা এবং নির্বাচনী আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার দেশটির বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে প্রায় এক হাজার নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ও পর্যবেক্ষণ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মোতায়েন করা হচ্ছে। বিচার বিভাগের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম। এর আগে বিভিন্ন প্রশাসনের আমলে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠানো হলেও এবারই প্রথম দেশের সব ৫০টি অঙ্গরাজ্যে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিচার বিভাগের সিভিল রাইটস ডিভিশনের সমন্বয়ে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পর্যবেক্ষকদের মধ্যে থাকবেন বিভাগের নিজস্ব কর্মকর্তা, বিচার বিভাগের অন্যান্য বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধি, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নিদের কার্যালয়ের কর্মকর্তা এবং অফিস অব পারসোনেল ম্যানেজমেন্টের ফেডারেল পর্যবেক্ষকরা। নির্বাচনের দিনজুড়ে সিভিল রাইটস ডিভিশনের কর্মকর্তারা অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন।
বিচার বিভাগের সিভিল রাইটস ডিভিশনের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হারমিত কে. ধিলন বলেন, `এই প্রশাসন ও সিভিল রাইটস ডিভিশনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে নির্বাচনের সততা ও অখণ্ডতা নিশ্চিত করা। বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারায় আমি অত্যন্ত গর্বিত। আমরা দৃঢ় ও বৈষম্যহীনভাবে নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা ফেডারেল ভোটাধিকার-সংক্রান্ত আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করবেন। এ ক্ষেত্রে সিভিল রাইটস ডিভিশনের ভোটিং সেকশন ভোটাধিকার সুরক্ষায় প্রণীত বিভিন্ন ফেডারেল আইনের বেসামরিক বিধান বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে। এসব আইনের মধ্যে রয়েছে ভোটাধিকার আইন (Voting Rights Act), জাতীয় ভোটার নিবন্ধন আইন (National Voter Registration Act), হেল্প আমেরিকা ভোট অ্যাক্ট (Help America Vote Act), ইউনিফর্মড অ্যান্ড ওভারসিজ সিটিজেনস অ্যাবসেন্টি ভোটিং অ্যাক্ট (Uniformed and Overseas Citizens Absentee Voting Act) এবং নাগরিক অধিকার আইনসমূহ (Civil Rights Acts)।

এ ছাড়া সিভিল রাইটস ডিভিশনের ডিজঅ্যাবিলিটি রাইটস সেকশন আমেরিকানস উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ অ্যাক্ট (ADA) বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করবে। অন্যদিকে, বিভাগের ক্রিমিনাল সেকশন জাতি, গায়ের রং, জাতীয় পরিচয় বা ধর্মের ভিত্তিতে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভোটদানে বাধা সৃষ্টি এবং ভোটাধিকার খর্ব করার মতো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধকারী ফেডারেল ফৌজদারি আইন বাস্তবায়নের বিষয়টি দেখবে।
বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, নির্বাচনের দিন এবং পরবর্তী পুরো সপ্তাহজুড়ে ফেডারেল ভোটাধিকার আইন-সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্ন, অভিযোগ বা অনিয়মের তথ্য গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রস্তুত থাকবেন। এ ধরনের অভিযোগ জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা ১-৮০০-২৫৩-৩৯৩১ নম্বরে নির্বাচনী হটলাইনে ফোন করতে পারবেন। এ ছাড়া VEM@usdoj.gov ঠিকানায় ই-মেইল অথবা www.civilrights.justice.gov/report ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ জমা দেওয়া যাবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার-সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য বিচার বিভাগের এডিএ তথ্যকেন্দ্রের টোল-ফ্রি নম্বর ১-৮০০-৫১৪-০৩০১ এবং টিটিওয়াই (TTY) নম্বর ১-৮৩৩-৬১০-১২৬৪। এ ছাড়া www.ada.gov ওয়েবসাইটেও অভিযোগ করা যাবে।
কোনো ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের জানাতে বলা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা, সহিংসতার হুমকি কিংবা ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটলে অবিলম্বে ৯১১ নম্বরে ফোন করে স্থানীয় পুলিশকে জানাতে হবে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার পর বিষয়টি বিচার বিভাগকেও জানাতে বলা হয়েছে।
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন শহর, কাউন্টি ও প্রশাসনিক এলাকায় পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হবে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে আলাবামার জেফারসন, মন্টগোমারি ও মোবাইল; আলাস্কার অ্যাঙ্করেজ, ডিলিংহাম ও কুসিলভাক; অ্যারিজোনার ম্যারিকোপা, পিমা, অ্যাপাচি ও নাভাজো এবং আরকানসাসের পুলাস্কি ও ওয়াশিংটন এলাকায় নির্বাচনী পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হবে।
এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস, আলামেডা, স্যাক্রামেন্টো ও সান ডিয়েগো; কলোরাডোর অ্যাডামস; কানেকটিকাটের নিউ হ্যাভেন; ডেলাওয়্যারের নিউ ক্যাসল; ফ্লোরিডার লিওন, হিলসবোরো, মায়ামি-ডেড, ব্রোওয়ার্ড ও পাম বিচ এবং জর্জিয়ার কব, ডিকাল্ব, ফুলটন, গুইনেট, চ্যাথাম ও বিব এলাকায় পর্যবেক্ষকরা দায়িত্ব পালন করবেন।
হাওয়াইয়ের হনলুলু, আইডাহোর এডা এবং ইলিনয়ের শিকাগো, কুক, চ্যাম্পেইন, স্যাঙ্গামন, সেন্ট ক্লেয়ার ও ম্যাডিসনেও পর্যবেক্ষক পাঠানো হবে। ইন্ডিয়ানার লেক ও ম্যারিয়ন; আইওয়ার লিন ও পোল্ক; কানসাসের জনসন, ওয়ায়ানডট ও সেডজউইক এবং কেনটাকির ফেয়েট ও জেফারসন এলাকাও এ কার্যক্রমের আওতায় থাকবে।
লুইজিয়ানার অরলিন্স, ইস্ট ব্যাটন রুজ ও লাফায়েট; মেইনের লুইস্টন, পোর্টল্যান্ড ও সাউথ পোর্টল্যান্ড; মেরিল্যান্ডের প্রিন্স জর্জেস; ম্যাসাচুসেটসের লোয়েল ও বোস্টন এবং মিশিগানের ল্যানসিং, ইস্ট ল্যানসিং, গ্র্যান্ড র্যাপিডস, ফ্লিন্ট, ডেট্রয়েট, হ্যামট্রামক, ওয়ারেন ও ডিয়ারবর্নে নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ চালানো হবে।
মিনেসোটার মিনিয়াপোলিস, হেনেপিন ও রামসে; মিসিসিপির লাফায়েট ও হিন্ডস; মিসৌরির সেন্ট লুইস, জ্যাকসন ও ক্লে; মন্টানার ইয়েলোস্টোন; নেব্রাস্কার ডগলাস এবং নেভাদার ক্লার্ক এলাকাও তালিকায় রয়েছে। নিউ হ্যাম্পশায়ারের ম্যানচেস্টার ও নাশুয়া এবং নিউ জার্সির মিডলসেক্স, বার্গেন ও ইউনিয়ন এলাকাতেও পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হবে।
নিউ মেক্সিকোর বার্নালিলো; নিউইয়র্কের নিউইয়র্ক, ওয়েস্টচেস্টার, কিংস, আলবানি ও ইরি; নর্থ ক্যারোলাইনার আলাম্যান্স, মেকলেনবার্গ ও ওয়েক এবং নর্থ ডাকোটার ক্যাস এলাকায়ও এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। একইভাবে ওহাইওর কুয়াহোগা, ফ্র্যাঙ্কলিন ও মেডিনা; ওকলাহোমার মাসকোগি, তুলসা ও ওকলাহোমা এবং ওরেগনের মাল্টনোমাহ এলাকায় পর্যবেক্ষকরা দায়িত্ব পালন করবেন।
পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া, অ্যালেগেনি, লুজার্ন ও লেহাই; রোড আইল্যান্ডের পটাকেট; সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লসটন; সাউথ ডাকোটার মিনেহাহা এবং টেনেসির ডেভিডসন, নক্স ও শেলবি এলাকাও পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে।
টেক্সাসের বেক্সার, ডালাস, হ্যারিস, ওয়ালার, ব্লাঙ্কো, বোয়ি ও নুয়েসেস; ইউটাহর সল্ট লেক; ভারমন্টের বার্লিংটন; ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিল, ফেয়ারফ্যাক্স, প্রিন্স উইলিয়াম ও ভার্জিনিয়া বিচ এবং ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কিং ও ইয়াকিমা এলাকায়ও পর্যবেক্ষক পাঠানো হবে। এ ছাড়া ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার কানাওয়াহ, উইসকনসিনের ম্যাডিসন ও মিলওয়াকি এবং ওয়াইয়োমিংয়ের ল্যারামি কাউন্টিতে নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও ভোটাধিকার সুরক্ষায় বিচার বিভাগের এই উদ্যোগকে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম হিসেবে দেখছে গোটা আমেরিকা।