রবীন্দ্রনাথের ইউরোপ ভ্রমণের শতবর্ষে লন্ডনে গীতবীণার বিশেষ গীতি-আলেখ্য

লন্ডন: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯২৬ সালের ইউরোপ ভ্রমণের শতবর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে লন্ডনে পরিবেশিত হলো বিশেষ গীতি-আলেখ্য ‘গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে’। গত ৩১ অক্টোবর কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের পিন্টার স্টুডিওতে আয়োজিত এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের যৌথ আয়োজক ছিল গীতবীণা, স্বাধীনতা ট্রাস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়টি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন গীতবীণার প্রধান উপদেষ্টা বাতিরুল হক সরদার। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন স্বাধীনতা ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক ও কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালেস্টার ওয়েনস। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন সুনীতা চৌধুরী ও রুমী হক। তাঁরা বাংলা ও ইংরেজিতে গীতবীণার বিশেষ গীতি-আলেখ্য পরিবেশনার ঘোষণা দেন। মূল সাংস্কৃতিক পর্বের সূচনায় স্বাধীনতা ট্রাস্টের সহসভাপতি ভ্যালেন্টাইন হার্ডিং রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে পাঠ করেন।

গীতবীণার বিশেষ নিবেদন ‘গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে’ শুরু হওয়ার আগে ড. শ্যামল চৌধুরী গীতবীণার একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব অরিজিৎ চৌধুরীর আকস্মিক প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি প্রয়াতের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং গীতবীণার প্রতি তাঁর অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

রবীন্দ্র-গবেষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব পীতম সেনগুপ্তের ধারাবর্ণনা এবং গীতবীণার সদস্য রুমী হকের ইংরেজি অনুবাদ পাঠের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে গীতি-আলেখ্যটি। এর সঙ্গে সংগতি রেখে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রনাথের ইউরোপ ভ্রমণকালে রচিত একাধিক গান। সমবেত ও দ্বৈত কণ্ঠে সংগীত পরিবেশন করেন রুমী হক, মিতালী বনোয়ারি ও সুনীতা চৌধুরী। রবীন্দ্রসংগীতের নির্ধারিত রাগাংশ পরিবেশন করেন স্বাধীনতা ট্রাস্টের সদস্য বুধাদিত্য ভট্টাচার্য। সব গানের সঙ্গে তবলা সংগত করেন সন্দীপ চক্রবর্তী। শব্দ নিয়ন্ত্রণ ও আলোক প্রক্ষেপণের দায়িত্বে ছিলেন কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির জুলস।

গীতি-আলেখ্যটির মূল ভাবনা, গবেষণা ও ধারাবর্ণনায় ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট রবীন্দ্র-গবেষক, লেখক ও প্রাবন্ধিক পীতম সেনগুপ্ত। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ১৯২৬ সালের ইউরোপ সফরে রবীন্দ্রনাথ যে বিপুলসংখ্যক গান রচনা করেছিলেন, তাঁর অন্য কোনো বিদেশ সফরে তেমনটি ঘটেনি। ৬৫তম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপনের পর ১৯২৬ সালের ১২ মে শান্তিনিকেতন থেকে নবমবারের মতো বিদেশ সফরে যাত্রা করেন কবি। দীর্ঘ সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে তাঁর এ সফরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের পাশাপাশি সৃজনশীল জীবনে নতুন অভিজ্ঞতা ও অনুভবের সংযোজন ঘটে।

ইতালি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও গ্রিসসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে কবির সফর তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতায় বিশেষ প্রভাব ফেলে। সফরকালে রচিত গানগুলোর মধ্য দিয়ে সেই সময়ের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও সৃষ্টিশীলতার পরিচয় তুলে ধরাই ছিল গীতি-আলেখ্যটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

গীতি-আলেখ্যের পরিবেশনা শেষে স্বাধীনতা ট্রাস্টের পরিচালক ড. আনসার আহমেদ উল্লাহ আয়োজক, শিল্পী, কলাকুশলী, সাংবাদিক ও দর্শকদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। অনুষ্ঠান সফল করতে সবার স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতার কথাও তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে গীতবীণার পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ট্রাস্টের সভাপতি জামিল ইকবাল, সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক ড. শ্যামল চৌধুরী এবং পীতম সেনগুপ্তকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়।

অনুষ্ঠানের সার্বিক সহযোগিতা ও মিলনায়তন ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সাদেক আহমেদ চৌধুরী, মৃন্ময় রায় চৌধুরী, মোজাম্মেল হোসেন ও আফরিন। রবীন্দ্রসংগীত, গবেষণা ও বর্ণনার সমন্বয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি চর্চা এবং রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।