নিউ ইয়র্ক — বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হত্যার ঘটনা বাড়ছে, কিন্তু অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হচ্ছে না। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর (UNESCO) নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে সাংবাদিক হত্যার প্রতি সাতটি ঘটনার মধ্যে ছয়টিরই বিচার হয় না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
২ নভেম্বর ২০২৬, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারহীনতা অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ইউনেস্কো। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে মোট ১৮৯ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। ২০২২ ও ২০২৩ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ২০ শতাংশ বেশি এবং ২০১৪-১৫ সালের পর দুই বছরে সাংবাদিক হত্যার সর্বোচ্চ সংখ্যা। নিহতদের মধ্যে ১২৭ জন, অর্থাৎ প্রায় ৬৭ শতাংশ, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রাণ হারিয়েছেন।
ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সময়কালে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ শতাংশে। আগের দুই বছরের তুলনায় এই হার এক শতাংশ বেড়েছে। ২০১২ সাল থেকে সংস্থাটি সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতার হার পরিমাপ করে আসছে। এক দশকের বেশি সময় পর এই হার বৃদ্ধির ঘটনা বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সাংবাদিকদের জন্য নতুন ও ভয়াবহ হুমকি হিসেবে ড্রোন হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নিহত সাংবাদিকদের মধ্যে ৫০ জন ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন, যা ওই এলাকায় সাংবাদিক হত্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। সাংবাদিকদের কর্মস্থল, অস্থায়ী সংবাদকেন্দ্র এবং সংবাদ সংগ্রহের সময় তাঁদের ওপর হামলার একাধিক ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক প্রেস লেখা পোশাক বা স্পষ্টভাবে ‘প্রেস’ চিহ্নিত গাড়িতে থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত এক বছরে অন্তত ৩৪ জন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রতি সাতটি হত্যার ছয়টিরই বিচার হয়নি। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বিচারহীনতার হার প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি। সাংবাদিকদের ওপর হামলা শুধু তাঁদের পরিবার ও সহকর্মীদের জন্য নয়, তথ্য জানার অধিকার থাকা পুরো সমাজের জন্যও গুরুতর আঘাত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইউনেস্কোর মহাপরিচালক খালেদ এল-এনানি বলেন, যুদ্ধের সম্মুখসারিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের জীবন দিতে হচ্ছে, অথচ তাঁদের হত্যার জন্য দায়ীদের অনেক ক্ষেত্রেই জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না। তিনি সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২২২ নম্বর প্রস্তাব বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
প্রতিবেদনে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় তাঁদের শারীরিক ঝুঁকির পাশাপাশি অনলাইন হয়রানি, হুমকি ও সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ছে। ইউনেস্কো এবং জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন আক্রমণের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সহিংসতার সম্পর্কও ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। ফলে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনলাইন ও অফলাইন—উভয় ক্ষেত্রেই কার্যকর সুরক্ষা প্রয়োজন।
তবে প্রতিবেদনে কিছু অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাত নেই এমন দেশগুলোতে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতার হার ২০১২ সালের ৯৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৭৭ শতাংশে নেমেছে। এসব দেশে সাংবাদিক হত্যার সংখ্যা গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ইউনেস্কোর মতে, কার্যকর তদন্ত, বিচার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারগুলো উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
সাংবাদিক হত্যা ও হামলার বিচার নিশ্চিত করা, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সংবাদকর্মীদের নিরাপদে কাজের পরিবেশ তৈরি করা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল গণমাধ্যমের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি মানুষের তথ্য জানার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের সুরক্ষার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।