শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেশজুড়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত একাধিক অঙ্গরাজ্যেও দলটির ঐতিহাসিক বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। নির্বাচনী এই ফলাফলকে মার্কিন রাজনীতিতে ‘নীল জোয়ার’ বা ‘Blue Wave’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো, ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে এগিয়েছে দলটি। এবিসি নিউজের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার মতো আসন পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদের শেষ দুই বছর ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।
মার্কিন সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৫১টি আসন। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসন ছিনিয়ে নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে। এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের উল্লেখযোগ্য বিজয়ের মধ্যে রয়েছে টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও ও আইওয়ার মতো অঙ্গরাজ্য। এসব রাজ্যের কয়েকটি দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল।
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছেন। ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম টেক্সাস থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেট নির্বাচনে জয়ী হলেন। কানসাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে পরাজিত করে ৯৪ বছরের ইতিহাস ভেঙেছেন। সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজ রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করে বড় ধরনের অঘটনের জন্ম দিয়েছেন।
নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করেছেন। ওহাইওতে সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউন রিপাবলিকান জন হাস্টেডকে হারিয়ে আবারও সিনেটে ফিরছেন। আইওয়ায় জশ টুরেকও রিপাবলিকান প্রার্থী অ্যাশলি হিনসনকে পরাজিত করে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে এনেছেন।
এ ছাড়া জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারে ক্রিস পাপাস সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।
নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ছিল সংকীর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ৪৩৫ সদস্যের এই কক্ষে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। নির্বাচনে নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা, ভার্জিনিয়া ও কলোরাডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের আসন হারানোর ফলে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্তিশালী হয়।
নিউ জার্সির সপ্তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রেবেকা বেনেট রিপাবলিকান টম কিন জুনিয়রকে পরাজিত করেছেন। ভার্জিনিয়ার দ্বিতীয় ডিস্ট্রিক্টে সাবেক কংগ্রেসওম্যান এলেইন লুরিয়া রিপাবলিকান জেন কিগানকে হারিয়ে আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন। এ ছাড়া নর্থ ক্যারোলাইনার জেমি অ্যাগার এবং কলোরাডোর ম্যানি রুটিনেলও গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেয়েছেন।
এবিসি নিউজ ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের প্রক্ষেপণ প্রকাশ করেছে। এনবিসি নিউজ ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও দলটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা জানিয়েছে। তবে সব আসনের চূড়ান্ত গণনা ও আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়ন সম্পন্ন হতে আরও সময় লাগতে পারে।
শুধু কংগ্রেস নয়, অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা বর্তমান রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করে অঙ্গরাজ্যটির প্রথম লাতিনা নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম টেক্সাসে কোনো ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হলেন।
জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমস, ওহাইওতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এবং আইওয়াতেও দলটির প্রার্থীরা গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় জেভিয়ার বেসেরা গভর্নর নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রক্ষেপণে জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, অভিবাসননীতি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনী জরিপ অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক ভোটার দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি তাদের পরিবারে মাঝারি বা গুরুতর আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া সরকারের স্বচ্ছতা, দুর্নীতি এবং প্রেসিডেন্টের নীতিনির্ধারণী অগ্রাধিকার নিয়েও ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে। নির্বাচনে এসব বিষয় রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী আবাসন, শ্রমিক অধিকার, গর্ভপাতের অধিকার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিকে নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্ব দিয়েছে।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে প্রশাসনের নীতিমালা, সরকারি ব্যয়, অভিবাসন কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত ও শুনানির সুযোগ বাড়বে।
প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কংগ্রেসের শুনানিতে হাজির করা, নথিপত্র তলব করা এবং সরকারি কার্যক্রমের ওপর নজরদারি জোরদার করতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেই প্রেসিডেন্টের সব নীতি বাতিল করা সম্ভব হবে না। কোনো বিল আইনে পরিণত করতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন। প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে তা অতিক্রম করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন দরকার।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তিনি নির্বাচনের ব্যালটে ছিলেন না; থাকলে রিপাবলিকানরা বড় ব্যবধানে জয়ী হতো। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট নেতারা নির্বাচনের ফলাফলকে ভোটারদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া এবং প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের জন্য শক্তিশালী বিরোধী অবস্থানে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যার পরিবর্তন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।