জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়নে ধনী দেশগুলোর ব্যর্থতা, বছরে ৩০৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন: জাতিসংঘ

শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি — জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন দিতে ব্যর্থ হচ্ছে ধনী দেশগুলো। জাতিসংঘের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বছরে প্রায় ৩০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। অথচ উন্নত দেশগুলো থেকে সরকারি পর্যায়ে যে অর্থায়ন আসছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির (UNEP) বুধবার, ৪ নভেম্বর প্রকাশিত ২০২৬ সালের ‘অ্যাডাপটেশন গ্যাপ রিপোর্ট: রেডি? নট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে উন্নত দেশগুলো থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু অভিযোজন খাতে আন্তর্জাতিক সরকারি অর্থায়ন ছিল আনুমানিক ২৮ দশমিক ২ থেকে ৩১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় এই অর্থায়ন মাত্র প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। অথচ ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বার্ষিক প্রয়োজন দাঁড়াবে প্রায় ৩০৫ বিলিয়ন ডলারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু অভিযোজনের জন্য অর্থায়নের ঘাটতি এতটাই বড় যে, ধনী দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থায়ন তিন গুণ করা হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ২৯ শতাংশ পূরণ হতে পারে। ২০২৫ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০-এ ২০৩৫ সালের মধ্যে অভিযোজন অর্থায়ন তিন গুণ করার যে প্রত্যাশা বা লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হলেও প্রয়োজনের তুলনায় বড় ঘাটতি থেকে যাবে।

ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেন, বিশ্ব এখনকার জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গেই যথাযথভাবে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত নয়; বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। তিনি আসন্ন কপ৩১ সম্মেলনসহ আন্তর্জাতিক আলোচনায় অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, মানুষের জীবন রক্ষা, অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং দেশগুলোর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অর্থায়ন আরও বাড়ানো জরুরি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল ও অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এসব দুর্যোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ এবং ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অর্থ ও অবকাঠামোর অভাবে বেশি সংকটে রয়েছে।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করছে। অভিযোজন কার্যক্রমে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক অর্থায়ন না এলে উপকূলীয় সুরক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো আরও চাপে পড়তে পারে।

ইউএনইপির প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়ন বাড়ানো এখন আর কেবল উন্নয়ন সহায়তার বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতি রক্ষার জরুরি বৈশ্বিক দায়িত্ব। ধনী দেশগুলো দ্রুত ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত না করলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি আরও বাড়বে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে সেই ক্ষতি মোকাবিলা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।