শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি — যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে বড় ব্যবধানে পেছনে ফেলে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন ডেমোক্র্যাটরা। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনেও রিপাবলিকানদের কাছ থেকে পদ ছিনিয়ে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন ‘ব্লু ওয়েভ’ বা নীল ঢেউ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার ৪ নভেম্বর সকাল পর্যন্ত ফলাফল এবং নির্বাচনী হিসাব অনুযায়ী, ১০০ সদস্যের সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা দুই স্বতন্ত্র সদস্যসহ তাদের ককাসের আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের আসন ৪৪। আরো দুটি আসনের ফলাফল চূড়ান্তভাবে ঘোষণা বাকি আছে। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিনেটে এই পরিবর্তন ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য। প্রতিনিধি পরিষদেও একই চিত্র। ৪৩৫ সদস্যের হাউজে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। প্রাথমিক ফলাফলে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন ২২৮টি আসন, আর রিপাবলিকানরা পেয়েছেন ১৩৯টি। বাকি আসনগুলোর গণনা এখনো চলছে। ফলে দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সিনেটের নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত একাধিক অঙ্গরাজ্যে। কানসাস, আইওয়া, টেক্সাস, ওহাইও, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা ও সাউথ ক্যারোলাইনা—এই সাতটি রাজ্যে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা সিনেট আসন ডেমোক্র্যাটরা পুনরুদ্ধার করেছেন। এর মধ্যে কানসাসে প্রায় এক শতাব্দী পর ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অ্যাডাম হ্যামিল্টন রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে পরাজিত করে রাজ্যটির রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছেন। আইওয়ায় জশ টুরেক রিপাবলিকান অ্যাশলি হিনসনকে হারিয়ে সিনেট আসনটি ডেমোক্র্যাটদের হাতে ফিরিয়ে এনেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে আইওয়ায় উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। সেই রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্য এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় চমক।
টেক্সাসে জেমস তালারিকো রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের এই জয় জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তালারিকো বিজয় ভাষণে বলেন, ‘আমরা টেক্সাসকে আবার ফিরিয়ে নিয়েছি।’ ওহাইওতে সাবেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেরড ব্রাউন রিপাবলিকান জন হুস্টেডকে পরাজিত করে আবার সিনেটে ফিরেছেন। মেইনে সাবেক অঙ্গরাজ্য সিনেট নেতা ট্রয় জ্যাকসন দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সকে হারিয়েছেন। আইওয়া, কানসাস ও টেক্সাসের পাশাপাশি এসব রাজ্যের ফলাফল সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করে সিনেট আসনটি ডেমোক্র্যাটদের হাতে তুলে দিয়েছেন।
মিশিগানেও ডেমোক্র্যাটদের আসন ধরে রাখার পাশাপাশি ইতিহাস গড়েছেন আবদুল এল-সায়েদ। রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সকে পরাজিত করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। অবসর নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের স্থলাভিষিক্ত হবেন এল-সায়েদ। নির্বাচনী প্রচারণায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়লেও বিজয় ভাষণে তাঁদের উদ্দেশে কটাক্ষ করেন তিনি। ভ্যান্সকে ‘হাবিবি’ বলে সম্বোধন করে এল-সায়েদ বলেন, আগামী জানুয়ারিতে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ভ্যান্সকেই তাঁকে সিনেটে শপথবাক্য পাঠ করাতে হবে। তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘ডেলিশাস আয়রনি’ বা চমৎকার পরিহাস বলে উল্লেখ করেন। ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, তাঁর নাম উচ্চারণ করতে সমস্যা হলে শপথের পর তাঁকে শুধু ‘সিনেটর’ বলে ডাকলেই চলবে।
এবারের নির্বাচনে সিনেটে আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। মিনেসোটা থেকে ডেমোক্র্যাট পেগি ফ্লানাগান রিপাবলিকান মিশেল টাফোয়াকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আদিবাসী আমেরিকান নারী সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। মিনেসোটার বর্তমান লেফটেন্যান্ট গভর্নর ফ্লানাগানের এই বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাস রিপাবলিকান সাবেক সিনেটর জন সুনুনুকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন। অন্যদিকে মিশিগানের আবদুল এল-সায়েদের বিজয় মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।
প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য ছিল ব্যাপক। এবারের নির্বাচনে তারা দুই ডজনের বেশি আসন রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যে কয়েকটি আসনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, সেসব এলাকাতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ইন্ডিয়ানার পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট জে ডি ফোর্ড তিনবারের নির্বাচিত রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান ভিক্টোরিয়া স্পার্টজকে পরাজিত করেছেন। টেক্সাসের সীমান্তবর্তী এলাকায় লাতিন গ্র্যামি বিজয়ী সংগীতশিল্পী ববি পুলিডো রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মনিকা দে লা ক্রুজকে হারিয়েছেন। আইওয়ার চারটি কংগ্রেশনাল আসনের মধ্যে তিনটিতেই ডেমোক্র্যাটরা জয় পেয়েছেন। ক্রিস্টিনা বোহানান, সারাহ ট্রোন গ্যারিয়ট ও লিন্ডসে জেমসের বিজয় রাজ্যটিতে দলটির শক্ত অবস্থান ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিনিধি পরিষদের নতুন স্পিকার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। হাউজে ডেমোক্র্যাটদের নেতা হাকিম জেফরিস স্পিকার নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হবেন। নতুন কংগ্রেস ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি অধিবেশন শুরু করলে সদস্যদের ভোটে স্পিকার নির্বাচন করা হবে। ফলে জেফরিসের স্পিকার হওয়া এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়, তবে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁকে এই পদে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমস, ওহাইওতে অ্যামি অ্যাক্টন, আইওয়ায় রব স্যান্ড এবং টেক্সাসে জিনা হিনোজোসা রিপাবলিকানদের কাছ থেকে গভর্নর পদ ছিনিয়ে নিয়েছেন। জর্জিয়ায় বটমসের বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পেতে যাচ্ছে ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর। তিনি রাজ্যটিরও প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হতে যাচ্ছেন। ওহাইওতে অ্যামি অ্যাক্টন রাজ্যটির প্রথম নির্বাচিত নারী গভর্নর হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন। টেক্সাসে জিনা হিনোজোসার বিজয়ও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজ্যটিতে ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হলেন। আইওয়ায় রব স্যান্ডের জয়ের মধ্য দিয়ে দুই দশক পর রাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাট গভর্নর ফিরে আসছেন।
নেভাডায় ডেমোক্র্যাট অ্যারন ফোর্ড রিপাবলিকান বর্তমান গভর্নর জো লম্বার্ডোকে পরাজিত করে রাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। নিউ মেক্সিকোতে ডেব হাল্যান্ড প্রথম আদিবাসী আমেরিকান নারী গভর্নর হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন। অন্যদিকে ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান বায়রন ডোনাল্ডস জয়ী হয়ে রাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের নীল ঢেউয়ের মধ্যেও ফ্লোরিডায় রিপাবলিকানরা গভর্নর পদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আলাবামায় রিপাবলিকান সিনেটর টমি টিউবারভিল গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। ওরেগনে ডেমোক্র্যাট টিনা কোটেক পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট জোসেলিন বেনসনও গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন।
নির্বাচনের ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আগামী দুই বছর প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ অনুমোদন এবং বাজেটসংক্রান্ত উদ্যোগে বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কংগ্রেসের কমিটিগুলোর নেতৃত্বও ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা বহাল থাকায় ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানেই হোয়াইট হাউসের সব সিদ্ধান্ত বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়।
ভোটার জরিপে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, ইরান যুদ্ধ এবং সরকারি দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের বড় একটি অংশ মনে করেছেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর কংগ্রেসের আরও কার্যকর নজরদারি থাকা প্রয়োজন। ট্রাম্প নিজে নির্বাচনী প্রচারণায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও তাঁর সমর্থিত একাধিক প্রার্থী গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে পরাজিত হয়েছেন।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাবর্তন, রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যে গভর্নর পদে পরিবর্তন এবং মুসলিম, আদিবাসী, কৃষ্ণাঙ্গ ও প্রকাশ্যে সমকামী প্রতিনিধিদের ঐতিহাসিক বিজয়—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন মার্কিন গণতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর এই নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।