এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দিল জাতিসংঘ, ২০২৯ পর্যন্ত সময় পেল বাংলাদেশ

শিব্বির আহমেদ, নিউইয়র্ক – স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ)। একই সময়ের জন্য প্রস্তুতিমূলক মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে নেপালেরও। ফলে বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের নতুন সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে ২৪ নভেম্বর ২০২৯। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ব্যাপক আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য দুই দেশই অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দায়িত্ব গ্রহণের দুই দিন পর জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (ইউএনসিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সময় বাড়ানোর আবেদন পাঠায়। সিদ্ধান্তে জাতিসংঘ বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতা এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় সৃষ্ট বিঘ্নের ঝুঁকি স্বীকার করেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং দেশের বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতাকেও অতিরিক্ত সময় দেওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

জাতিসংঘ আরও উল্লেখ করেছে, প্রচলিত এলডিসি উত্তরণ কাঠামোয় সাধারণত কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন সময় বাড়ানোর স্বীকৃত কারণ নয়। তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের জটিলতা ও বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনার দাবি রাখে।

জাতিসংঘের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্ধিত প্রস্তুতিকালীন সময়ে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম জোরদার ও অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে একটি জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল (Smooth Transition Strategy) বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে এ কৌশল বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির কাছে বার্ষিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিয়মিত তথ্য দিতে হবে।

বাংলাদেশের আবেদন পাওয়ার পর ইউএনসিডিপি ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ২৮তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য একটি প্যানেল গঠন করে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি আরও বিবেচনার জন্য সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সুপারিশ করে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে জি-৭৭ভুক্ত দেশগুলোর সমর্থন ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) এ আবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। উত্তরণের পর বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এতে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে এলডিসি সুবিধার আওতায় বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিকারকেরা ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্যিক জোটে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাচ্ছেন। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার আওতায় রয়েছে।

ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকেরা দীর্ঘদিন ধরে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত তিন বছর সময় পেলে নতুন বাজারে প্রবেশ, বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে।

জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি সূচক—মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (GNI), মানবসম্পদ সূচক (HAI) এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (EVI)—পূরণ করে বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত ছিল। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় ছিল ২ হাজার ৬৮৪ ডলার। মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭৭ দশমিক ৫ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে ২১ দশমিক ৯। তিনটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ নির্ধারিত উত্তরণ মানদণ্ড পূরণ করে।

২০১৮ সালের মার্চে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো তিনটি মানদণ্ড পূরণ করে। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ইউএনসিডিপির দ্বিতীয় ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় দেশটিকে এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়। কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশ এর আগে দুই বছরের অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল পেয়েছিল। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য হতে তিনটি মানদণ্ডের অন্তত দুটি পূরণ করতে হয়। পাশাপাশি পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় সেই অর্জন ধরে রাখতে হয়।

এলডিসি উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের বৃহত্তম স্বল্পোন্নত অর্থনীতিগুলোর একটি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্য সুবিধার অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হিসেবে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে রপ্তানি বাজার ধরে রাখা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ।

নতুন সময়সীমা সরকার, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক ও উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য প্রস্তুতি জোরদার করার সুযোগ তৈরি করবে। তবে এ সময়ের কার্যকর ব্যবহার নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন, নতুন বাণিজ্য চুক্তি এবং দেশের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর। জাতিসংঘের দেওয়া অতিরিক্ত তিন বছর বাংলাদেশের জন্য শুধু সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; বরং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মসৃণ এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।