কিউবার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জাতিসংঘের, সমর্থন কমেছে

শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক – কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। তবে গত বছরের তুলনায় এবার প্রস্তাবটির পক্ষে সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বুধবার অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবের পক্ষে ১৩০টি দেশ ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট দেয় ১৭টি দেশ এবং ভোটদানে বিরত থাকে ২৫টি দেশ। ২০২৫ সালে একই ধরনের প্রস্তাবের পক্ষে ১৬৫টি দেশ ভোট দিয়েছিল, বিপক্ষে ছিল সাতটি দেশ এবং ভোটদানে বিরত ছিল ১২টি দেশ।

১৯৬০ সালে শুরু হওয়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অবসান চেয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯২ সাল থেকে প্রায় প্রতিবছরই এ ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ করে আসছে। তবে সাধারণ পরিষদের এই প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। ফলে এর মাধ্যমে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাধ্য করা যায় না।

এবারের ভোটে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে সরে এসে ভোটদানে বিরত থাকে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে জার্মানি, ইতালি ও লাটভিয়া। এ ছাড়া কয়েকটি দেশ এবার প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, যাদের অনেকে আগের বছরগুলোতে এমন অবস্থান নেয়নি। ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ভোটের এই পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ ভোটের ফলকে ওয়াশিংটনের অবস্থানের পক্ষে সমর্থন বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরেন।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, কিউবার অর্থনৈতিক সংকটের প্রধান কারণ দেশটির সরকারের নীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা। ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞাকে কিউবার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করে। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ পারিয়েয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, মার্কিন বিধিনিষেধের প্রভাব দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়ছে।

কিউবার বক্তব্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানি, ওষুধ, খাদ্যসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও প্রাপ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটির সরকার মনে করে, এসব বিধিনিষেধ কিউবার সার্বভৌমত্ব এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্য পরিচালনার সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দেশটির নিজস্ব সরকারি নীতিকে দায়ী করে আসছে। নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এবং সংকটের জন্য দায়ী কারণগুলো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ রয়েছে।

১৯৯২ সাল থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কিউবার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রতিবছর ভোটাভুটি হয়ে আসছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০ সালে এর ব্যতিক্রম ঘটে। ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে প্রতিটি ভোটেই প্রস্তাবের পক্ষে ১৯১টি করে ভোট পড়েছিল। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্কেও কিছুটা উন্নতি দেখা গিয়েছিল।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিউবা বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট মোকাবিলা করছে। এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও হাভানার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বিতর্কেও যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলেও এর মাধ্যমে দেশটিকে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাধ্য করা সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইনগত ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পদক্ষেপ প্রয়োজন, যার মধ্যে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা রয়েছে।

এবারের ভোটে প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন কমে যাওয়া আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার দীর্ঘদিনের বিরোধ যে এখনো অমীমাংসিত, ভোটের ফল সেটিও স্পষ্ট করেছে।