২০১০ সাল থেকে সৌদি আরবে অন্তত ১৯ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

ঢাকা: ২০১০ সাল থেকে সৌদি আরবে অন্তত ১৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য অংশ এই শাস্তির শিকার হচ্ছেন। সর্বশেষ গত ১৪ অক্টোবর পবিত্র নগরী মক্কায় এক বাংলাদেশি পুরুষ ও এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে রিয়াদে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন কিংবা সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো এ বিষয়ে অবগত ছিল না। ঘটনাটি বাংলাদেশে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে, তাঁর হাতে একটি কূটনৈতিক নোট হস্তান্তর করেছে এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের সুরক্ষায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনগুলো। তাদের মতে, এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করেন এবং দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান। অথচ প্রবাসী কর্মীরা এখনো যথাযথ সুরক্ষা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ইউরোপভিত্তিক ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার (ইএসওএইচআর) ২০২২ সালের Bloodshed and Lies: Mohammed bin Salman’s Kingdom of Executions শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদি আরবে অন্তত ১৬ জন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সংস্থাটির ২০২৫ সালের আরেকটি প্রতিবেদনেও অন্তত একজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।

ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদি আরবে মোট ১ হাজার ২৪৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৪৯০ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। বিদেশিদের মধ্যে পাকিস্তানের ১৬৪ জন, ইয়েমেনের ৯২ জন, সিরিয়ার ৫৮ জন, মিশরের ২৬ জন, জর্ডানের ২৫ জন, নাইজেরিয়ার ১৭ জন, ইথিওপিয়ার ১৫ জন এবং চাদের ১৪ জন নাগরিক ছিলেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যেও সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪ সালে অন্তত ১২২ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ জুন পর্যন্ত দেশটিতে আরও ৯৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

২২ জুন প্রকাশিত এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি জানায়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে ২ হাজার ৮৪ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যার দিক থেকে সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। মাদকসংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকেরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এ ধরনের মৃত্যুদণ্ডের ৭৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৭৮ শতাংশ ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকেরা শাস্তির শিকার হন।

ইএসওএইচআর জানিয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের অধিকাংশ মামলাই মাদক পাচার ও চোরাচালানের সঙ্গে সম্পর্কিত। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অনেকেই দরিদ্র পরিবারের নিম্নপর্যায়ের মাদক বহনকারী ছিলেন, যাঁরা শরীরের ভেতরে বা অন্যভাবে মাদক লুকিয়ে বহন করতেন। তাঁদের কেউ কেউ মানব পাচার কিংবা অপরাধী চক্রের জবরদস্তির শিকার হয়েছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পেছনে কর্মক্ষেত্রে গুরুতর নির্যাতন, দুর্ঘটনা কিংবা নিয়োগকর্তার শারীরিক ও যৌন নির্যাতন থেকে আত্মরক্ষার পরিস্থিতি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া গ্যাং গঠন, ডাকাতি ও যৌন অপরাধের মতো প্রাণঘাতী নয় এমন অপরাধেও বিদেশি নাগরিকদের বিচারকের বিবেচনাধীন ক্ষমতায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি। বিরল ক্ষেত্রে জাদুবিদ্যা বা কুসংস্কারসংক্রান্ত অভিযোগেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ডানা আহমেদ ২২ জুনের বিবৃতিতে বলেন, “সৌদি আরবে এমন অপরাধেও মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে, যেগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক আইন ও মানদণ্ড অনুযায়ী কখনোই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত নয়।”

আহমেদের মতে, কঠোর মাদকবিরোধী নীতির কারণে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার বাড়তে থাকা একটি উদ্বেগজনক বৈশ্বিক প্রবণতার প্রতিফলন এই পরিস্থিতি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এসব বেআইনি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে এবং মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তির পথে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সৌদি আরবকে অবিলম্বে এই শাস্তি কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দিতে হবে।