ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলায় উদ্‌যাপিত হচ্ছে বিজয়া দশমী

ঢাকা: ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে আজ বুধবার সারা দেশে উদ্‌যাপিত হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার শেষ দিন বিজয়া দশমী। দিনের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যায় নদী, পুকুরসহ বিভিন্ন জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ছয় দিনব্যাপী দুর্গোৎসব। বিজয়া দশমী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে ভক্তদের সমাগম ঘটেছে। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালীমন্দির, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির এবং রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠসহ বিভিন্ন স্থানে পূজা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালিত হচ্ছে। পাশাপাশি স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতজনদের মধ্যে বিনিময় করা হচ্ছে বিজয়ার শুভেচ্ছা।

বিজয়া দশমীর অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার চরণে সিঁদুর ও মিষ্টি নিবেদন করেন। এরপর একে অপরের কপাল ও মুখে সিঁদুর লাগিয়ে এবং মিষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমে উৎসবে অংশ নেন। সংসারের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও দাম্পত্য জীবনের মঙ্গল কামনায় এই রীতি পালন করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চলে সিঁদুর খেলা বিশেষভাবে প্রচলিত। ঐতিহ্যগতভাবে নারীরা এই আচার পালন করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতে পুরুষ ভক্তদের অংশগ্রহণও দেখা যাচ্ছে। ফলে পূজামণ্ডপগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

সকালে বিভিন্ন মন্দির ও অস্থায়ী পূজামণ্ডপে দশমীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর আয়োজিত হয় দর্পণ বিসর্জন, যেখানে প্রতিমা বিসর্জনের আগে আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্ব বিসর্জনের প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। পরে ঢাকঢোল ও ধর্মীয় স্লোগানের মধ্য দিয়ে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা বের হয়। এসব শোভাযাত্রা বিভিন্ন জলাশয়ের দিকে এগিয়ে যায়।

ঐতিহ্যগতভাবে বাঁশের কাঠামোতে বহন করা হলেও বর্তমানে অনেক প্রতিমা সাজানো ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে করে বিসর্জনস্থলে নেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে নৌকায় করে নদীর মাঝখানে নিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। এ সময় ভক্তদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে, “আসছে বছর আবার হবে”—আগামী বছর আবারও দেবী দুর্গার আগমনের প্রত্যাশায় উচ্চারিত এই স্লোগান।

রাজধানীতে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ, কলাবাগান, বনানী, শাঁখারীবাজার এবং রমনা কালীমন্দিরসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সকাল থেকেই ভক্তদের ভিড় দেখা গেছে। প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জনসমাগমের আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তা জোরদার ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ব্যবস্থা নিয়েছে। রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর এবং নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলা শহরেও বিজয়া দশমী উদ্‌যাপিত হচ্ছে।

প্রতিমা বিসর্জনের পর পরিবারের ছোটরা বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেন। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কোলাকুলি এবং বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয়। এ উপলক্ষে চমচম, কালোজাম, সন্দেশ ও নারকেলের নাড়ুসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পরিবার, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে ভক্তরা আগামী বছর আবারও দেবী দুর্গার আগমনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করছেন।