যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্র ও অবাধ নির্বাচনের পক্ষে থাকার আহ্বান শেখ হাসিনার

শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি — বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের স্বাধীন মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সেন্টার ফর ইউএসএ-বাংলাদেশ রিলেশনস এর আয়োজনে ১৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংট ডিসির জাতীয় ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং বাংলাদেশের জনগণ যেন অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের সরকার নির্ধারণ করতে পারে, সেই নীতির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকা উচিত।

“আমি যুক্তরাষ্ট্রকে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে বেছে নিতে বলছি না। আমি যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্র বেছে নিতে বলছি,” বলেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সাংবিধানিক শাসন, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং আইনের চোখে সমান অধিকারের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে ভিন্নমতকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক দলকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে বাদ দেওয়া কিংবা লাখ লাখ নাগরিকের অধিকার উপেক্ষা করা উচিত নয়।

আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাঁদের রাজনৈতিক পরিসর থেকে বাদ দেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের বিরোধীদের অধিকারও সম্মান করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিশোধের পরিবর্তে সমঝোতা ও পুনর্মিলনের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে।

নিজের সরকারের ভূমিকা, ২০২৪ সালের ঘটনাবলি এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এসব প্রশ্নের জবাব দিতে তিনি প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর নিজেরসহ যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত, রাজনৈতিক ঘোষণা বা বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়।

সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবার, বেআইনিভাবে আটক ব্যক্তিরা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ন্যায্য আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় এবং ন্যায়বিচার ছাড়া স্থায়ী শান্তিও নিশ্চিত করা যায় না।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার পক্ষে মত দিয়ে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মার্কিন বিনিয়োগ, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে অংশীদারত্ব, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জাপান ও ইউরোপের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ যেন বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র না হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারে, সেই প্রত্যাশাও তুলে ধরেন তিনি।

শেখ হাসিনার মতে, বঙ্গোপসাগর ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের লাখো মানুষের জীবিকার সম্পর্ক দুই দেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিকে পারস্পরিক স্বার্থের বিষয় করে তুলেছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বা সরকারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উচিত।

নিজের সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সুবিধা, ডিজিটাল সংযোগ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উন্নয়নের অজুহাতে গণতন্ত্র সীমিত করা উচিত নয়। একইভাবে গণতন্ত্রের নামে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করাও কাম্য নয়। বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র ও উন্নয়ন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার ও পুনর্মিলন—সবকিছুরই প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনা এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরেন, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ হবে, নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হবে ভোটারের সিদ্ধান্তে, সাংবাদিকেরা ভয় ছাড়াই সংবাদ পরিবেশন করতে পারবেন এবং তরুণেরা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক সুযোগ রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত এবং প্রত্যেক নাগরিকের দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অবাধ নির্বাচন, স্বাধীন আদালত, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংগঠন করার অধিকার, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতি সমর্থন চান।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি-আমেরিকান সম্প্রদায়কে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, কর্মী ও কমিউনিটি নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে অবদান রাখছেন। শেখ হাসিনার মতে, কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল বা মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বন্ধুত্ব টিকে থাকা উচিত।

সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন সেন্টার ফর ইউএসএ-বাংলাদেশ রিলেশনস এর এক্সেকিউটিভ ডিরেক্টর রানা হাসান মাহমুদ। সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।