ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তের কাছাকাছি: রুবিও

মুম্বাই, ভারত: ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। মঙ্গলবার মুম্বাইয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, চুক্তিটি সম্পন্ন করতে অল্পসংখ্যক বিষয়ের সমাধান বাকি রয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। রুবিও বলেন, “চুক্তি সম্পাদনের আগ পর্যন্ত যতটা কাছাকাছি থাকা সম্ভব, আমরা এখন ততটাই কাছাকাছি।” তাঁর আশা, বাকি বিষয়গুলোর সমাধান হলে শিগগিরই চুক্তির ঘোষণা দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তা স্বাক্ষর করা সম্ভব হবে।

ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে রুবিও বলেন, বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ ও বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও রয়েছে। তিনি চার দেশের কৌশলগত জোট কোয়াডে ভারতের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। এই জোটে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া রয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে মতপার্থক্য তৈরি করেছে। রুবিও বলেন, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সরাসরি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা পরিচালনা না করলেও এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছেন।

এদিকে ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের জবাবে রুবিও জানান, মঙ্গলবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে তাঁর ৪৫ মিনিটের টেলিফোনে কথা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ বা পরিবর্তনের কোনো নির্দেশ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেননি। ইউক্রেনকে ইচ্ছাকৃতভাবে সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় প্রসঙ্গে রুবিও বলেন, প্রেসিডেন্ট এ ধরনের কোনো পরিবর্তনের নির্দেশ দেননি। তবে ইউক্রেনের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থায়নে কেনা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে বিলম্বের সম্ভাবনা তিনি স্বীকার করেন। এসব অস্ত্র ন্যাটো-সমর্থিত প্রায়োরিটাইজড ইউক্রেন রিকোয়ারমেন্টস লিস্ট বা পিইউআরএল কর্মসূচির আওতায় কেনা হয়েছিল।

রুবিও বলেন, বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা চাহিদা এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে অস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হয়। ইউক্রেনের চাহিদার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যান্য অংশীদারের প্রতিও ওয়াশিংটনের দায়বদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। এসব অস্ত্র তৈরি ব্যয়বহুল এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়াও সময়সাপেক্ষ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ছে বলে জানান তিনি।

রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার আগাম সতর্কবার্তা ইউক্রেনের কাছে পৌঁছানো এবং সেসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ১৩ ও ১৮ অক্টোবর কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান রুবিও। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় কোনো সমস্যা ঘটে থাকলে তা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা তথ্য আটকে রাখার সিদ্ধান্তের কারণে হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না।

ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে আলোচনার অগ্রগতি না হওয়ায় ট্রাম্প হতাশ বলে জানান রুবিও। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানোই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। তাঁর মতে, প্রতিদিনের প্রাণহানি, ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। জ্বালানি অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিভিন্ন সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও জ্বালানির দাম নিয়ে বহু দেশ চাপের মুখে রয়েছে।

ভারতের সঙ্গে আলোচনায় জ্বালানি সহযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন রুবিও। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল পরিশোধনে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর আরও ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। ভারী অপরিশোধিত তেল পরিশোধনে ভারতের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে এবং দেশটির কোম্পানিগুলো অতীতেও এ ধরনের তেল প্রক্রিয়াজাত করেছে।

রুবিও জানান, বুধবার গুজরাটের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শোধনাগার পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং বাণিজ্যিক সুযোগ নিয়ে কথা বলবেন তিনি। তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলার তেলের সরবরাহ বাড়লে স্বল্পমেয়াদে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের ঘাটতি পূরণে শুধু ভেনেজুয়েলার তেল যথেষ্ট হবে না। এ ক্ষেত্রে মাদুরো সরকারের ওপর বিদ্যমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হবে বলে জানান তিনি।

রুবিও বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল তেল উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়; তেল পরিশোধন, পরিবহন এবং সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি পাওয়ার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন, সৌদি আরবের পাইপলাইন এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ভারতের জ্বালানি উৎস বহুমুখী করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে রুবিও বলেন, রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এক দিন থেকে অন্য দিনে একটি বড় জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ থেকে সরে আসা সহজ নয় বলেও তিনি স্বীকার করেন। তাঁর মতে, বৈচিত্র্যময় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভারতের অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব—উভয়ের জন্যই ইতিবাচক।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের নেতাদের মধ্যে পারমাণবিক নিরাপত্তা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠনের ধারণাকে সমর্থন করেন রুবিও। তিনি বলেন, বিশ্বের তিন প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর দেশের নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

রুবিওর ভাষায়, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের অধিকারী দেশগুলোর নেতারা অন্তত পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে বিশ্ব আরও নিরাপদ থাকে। চীন এ ধরনের আলোচনায় অংশ নিতে রাজি হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলে জানান তিনি। তবে পারস্পরিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। রুবিওর বক্তব্যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রচেষ্টা, ইউক্রেনকে মার্কিন সামরিক সহায়তা, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।