শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক : জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের দৌড় গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ অনানুষ্ঠানিক ভোটে কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকলেও পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের বিরোধিতার কারণে এখনো কোনো প্রার্থী চূড়ান্ত সমর্থন অর্জন করতে পারেননি।
রয়টার্সের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের ষষ্ঠ অনানুষ্ঠানিক ভোটে গ্রিনস্প্যান নয়টি ‘সমর্থনযোগ্য’, পাঁচটি ‘অসমর্থনযোগ্য’ এবং একটি ‘মতামত নেই’ ভোট পেয়েছেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে পড়া পাঁচটি নেতিবাচক ভোটের মধ্যে দুটি এসেছে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের কাছ থেকে। মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় এখনো কোনো প্রার্থী এমন সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেননি, যা নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের বিরোধিতা অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট।
গ্রিনস্প্যানের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি এবং গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বার্কেটও আলোচনায় রয়েছেন। দ্য ন্যাশনাল–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ ভোটে তাঁরা প্রত্যেকে আটটি ‘সমর্থনযোগ্য’ এবং ছয়টি ‘অসমর্থনযোগ্য’ ভোট পেয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেও নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্যের আপত্তি রয়েছে। কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডির (UNCTAD) সাবেক প্রধান গ্রিনস্প্যান জাতিসংঘের কার্যকারিতা বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন।
রয়টার্সের ১৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিনস্প্যান মনে করেন, জাতিসংঘ অতিরিক্ত ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতায় ভুগছে। সংঘাত নিরসনে আরও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ, সংঘাত প্রতিরোধে জোর দেওয়া এবং বিভিন্ন জাতিসংঘ সংস্থার মধ্যে দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন। নির্বাচিত হলে গ্রিনস্প্যান হবেন ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর সংস্থাটির প্রথম নারী মহাসচিব।
জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদ মহাসচিব নিয়োগ দেয়। প্রচলিত নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত নয়টি ইতিবাচক ভোট পেতে হয় এবং পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কারও ভেটোর মুখে পড়া যাবে না। পাঁচ স্থায়ী সদস্য হলো চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। তাঁদের যেকোনো একজনের ভেটো কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন আটকে দিতে পারে।
সর্বশেষ অনানুষ্ঠানিক ভোট তাই চূড়ান্ত নির্বাচন নয়। বরং এটি প্রার্থীদের অবস্থান এবং তাঁদের সামনে থাকা কূটনৈতিক বাধাগুলোর একটি চিত্র তুলে ধরে। নিরাপত্তা পরিষদ কোনো প্রার্থীর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালে তাঁকে সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করা হবে। প্রক্রিয়াটি এখনো উন্মুক্ত রয়েছে। নতুন প্রার্থী যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর চাপ বাড়ছে।
বিশ্বজুড়ে সশস্ত্র সংঘাত, মানবিক সংকট, ভূরাজনৈতিক বিভাজন এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। নতুন মহাসচিবের সামনে থাকবে সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘের ভূমিকা জোরদার করা, মানবিক সহায়তার সমন্বয়, টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সর্বশেষ ভোটে গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকলেও তাঁর নিয়োগের পথ এখনো নিশ্চিত নয়। শেষ পর্যন্ত কোনো প্রার্থী নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়োজনীয় সমর্থন অর্জন করতে পারবেন কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।