যুদ্ধে মানুষের সিদ্ধান্তকে ছাপিয়ে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক: সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্রমবর্ধমান ব্যবহার মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা কমিয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত, অনিচ্ছাকৃত সংঘাতের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইউএনআইডিআইআর) পরিচালক রবিন গেইস। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে গেইস প্রশ্ন করেন, “আমরা কি যন্ত্রকে মানুষের লক্ষ্য নির্ধারণ ও হত্যা করার অনুমতি দিতে যাচ্ছি?”

তিনি সতর্ক করে বলেন, সামরিক ক্ষেত্রে এআই এমন এক পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। জাতিসংঘের মহাসচিব বারবার আহ্বান জানিয়েছেন, সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের বিষয়ে এমন সীমা নির্ধারণ করতে হবে, যাতে বিশ্ব কোনো ‘নৈতিক সীমারেখা’ অতিক্রম না করে।

গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ, ড্রোন পরিচালনা এবং সাইবার হামলার সমন্বয়সহ সামরিক কার্যক্রমের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। গেইসের মতে, এসব ক্ষেত্রে এআইয়ের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির ফলে মানুষের বিচার-বিবেচনার ভূমিকা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্রসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও এ উদ্বেগ প্রাসঙ্গিক। এআইনির্ভর প্রযুক্তি লক্ষ্য শনাক্ত করা থেকে শুরু করে হামলা চালানো পর্যন্ত সময় কমিয়ে আনছে। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীগুলোকে প্রতিদিন আগের তুলনায় অনেক বেশি লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান পরিচালনার সুযোগ দিচ্ছে।

তবে এসব প্রযুক্তির অনেকগুলোর কার্যপ্রণালি পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়। ফলে ভুল শনাক্তকরণ, ভুল হিসাব এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরির ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর পরিণতিতে অনিচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। গেইস আরও সতর্ক করেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা সহজ হয়ে উঠলে অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও আরও জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনায় এ প্রযুক্তির সহায়তা নিতে পারে।

গেইস স্বীকার করেন, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সামরিক ক্ষেত্রে এআই নিয়ন্ত্রণের পথে বড় বাধা। তবে তাঁর মতে, এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের দেশগুলোর মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে উদ্বেগের মিল দেখা যাচ্ছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চীনের সঙ্গে একটি এআই-সংক্রান্ত ‘নোটিফিকেশন মেকানিজম’ বা পারস্পরিক অবহিতকরণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন।

এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে—এমন এআই-সংক্রান্ত ঘটনার বিষয়ে বিশ্বের দুই বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী দেশ যেন পরস্পরকে সতর্ক করতে পারে। গেইস বলেন, সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা নিয়ে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়নে জাতিসংঘের মহাসচিবের আহ্বাদও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সাড়া পাচ্ছে।

সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে কাজ করছে ইউএনআইডিআইআর। গেইস জানান, বৃহস্পতিবার ইউএনআইডিআইআরের সেন্টার অব এক্সিলেন্স অন এআই, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা এবং সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে একটি নতুন বহুপক্ষীয় ফোরাম চালু করার পরিকল্পনা করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘোষণার সময় জাতিসংঘ ব্যবস্থার মধ্যে এ ধরনের এটিই প্রথম ও একমাত্র ফোরাম।

ফোরামটির কার্যক্রম তিনটি প্রধান বিষয়ে কেন্দ্রীভূত থাকবে। প্রথমত, দায়িত্বশীল শিল্পচর্চা: সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য এআই প্রযুক্তি তৈরি ও উন্নয়নের সময় কোম্পানিগুলো যাতে দায়িত্বশীল আচরণ করে, সে জন্য বাস্তবভিত্তিক ও স্বেচ্ছামূলক নির্দেশিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দ্বিতীয়ত, এআই নিরাপত্তার অভিন্ন পরিভাষা: ‘স্বায়ত্তশাসন’, ‘নিরাপত্তা’ ও ‘সুরক্ষা’র মতো গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর অর্থ স্পষ্ট করতে একটি ‘এআই সিকিউরিটি লেক্সিকন’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিভিন্ন পক্ষ এসব শব্দ ভিন্নভাবে ব্যবহার করায় পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয়ত, অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর অপব্যবহার প্রতিরোধ: অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কীভাবে এআই ব্যবহার করে সামরিক পরিকল্পনা, অভিযান পরিচালনা ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে, সেই ঝুঁকি মোকাবিলার উপায় খতিয়ে দেখা হবে।

সামরিক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার যুদ্ধের ধরন এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। এআইনির্ভর সামরিক ব্যবস্থা যত বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মানুষের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা, ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি কমানো এবং অনিচ্ছাকৃত সংঘাত প্রতিরোধ করা। সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার ভিত্তি তৈরি করাই নতুন ফোরামের অন্যতম লক্ষ্য।