শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক: বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় বাড়তে থাকলেও কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জলবায়ু সহযোগিতায় আস্থা পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। আগামী নভেম্বরে তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এর আগে এই আহ্বানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমানের উদ্যোগে ১৬ অক্টোবর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জলবায়ু সম্মেলনের ধারাবাহিক সভাপতিত্বের সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক জলবায়ু কার্যক্রমে আস্থা ফিরিয়ে আনার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
নেপালে চরম আবহাওয়াজনিত বিপর্যয়ের ধ্বংসযজ্ঞ জলবায়ু পরিবর্তনের মানবিক মূল্য আবারও সামনে এনেছে। বৈঠকের সূচনায় খলিলুর রহমান বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তা এবং বিপর্যয় মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ ও জনগোষ্ঠীর প্রস্তুতির মধ্যে ব্যবধানের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি আরও সতর্ক করেন, শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সৃষ্ট ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
জাতিসংঘের বৈঠকসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান জলবায়ুনীতি অব্যাহত থাকলে শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের তুলনায় বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রায় ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার পথে রয়েছে। এই পূর্বাভাস ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে নির্ধারিত তাপমাত্রা সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এ পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান অঙ্গীকার ও নীতিমালা এখনো যথেষ্ট নয়। নির্ধারিত জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে দেশগুলোকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১। এই সম্মেলনে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার নতুন সুযোগ তৈরি হবে। দেশগুলোর ঘোষিত জলবায়ু প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে থাকবে।
রয়টার্সের ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কপ৩১-এ নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ জোরদার করতে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। এতে জাতিসংঘের নিঃসরণ প্রশমনবিষয়ক কর্মসূচির মেয়াদ ২০২৬ সালের পরও বাড়ানো এবং দেশগুলোর বিদ্যমান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উৎসাহ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন নিয়ে মতপার্থক্য আন্তর্জাতিক আলোচনাকে জটিল করে তুলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবে নতুন জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি না থাকায় দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য আরও সহায়তা চায়।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে জলবায়ু কূটনীতিতে আস্থা পুনরুদ্ধারের অর্থ কেবল উচ্চাভিলাষী ঘোষণা নয়। এর জন্য প্রয়োজন পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়ন, সহজলভ্য প্রযুক্তি এবং জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর সহায়তা। বিশেষ করে যেসব দেশ ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গুরুতর ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তাদের জন্য এসব সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের বৈঠকে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি বাড়ানো এবং জলবায়ু সহায়তা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।স্বল্পোন্নত দেশ, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ এবং নিচু উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর জন্য জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি বিশেষভাবে জরুরি।
বাংলাদেশের মতো দেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজনবিষয়ক আলোচনার ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিঃসরণ কমানো ও অর্থায়ন নিয়ে মতপার্থক্যের বাইরেও আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহযোগিতা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। গত ১৬ অক্টোবর ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল—আইপিসিসি—এর একটি বৈঠক পরবর্তী প্রধান বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশের সময়সূচি নিয়ে সমঝোতা ছাড়াই স্থগিত করা হয়। এই অচলাবস্থায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, ২০২৮ সালের জাতিসংঘ জলবায়ু আলোচনা এবং প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জনে বৈশ্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনার আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা সম্ভব হবে কি না।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০টি দেশের একটি জোট দ্রুত অগ্রগতির পক্ষে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে কয়েকটি দেশ কম সম্পদসম্পন্ন রাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আরও সময় দেওয়ার পক্ষে মত দেয়। আইপিসিসি জানিয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের সময়সূচি ও বাজেট নিয়ে আলোচনা এখনো উন্মুক্ত রয়েছে এবং যত দ্রুত সম্ভব তা আবার শুরু হবে।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতির বৃহত্তর চ্যালেঞ্জটিও সামনে এনেছে। দেশগুলোকে শুধু কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে নয়; বরং বৈজ্ঞানিক তথ্য কীভাবে নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়েও সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
কপ৩১ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে দেশগুলো নিজেদের মতপার্থক্য কমিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাস্তব ফল অর্জন করতে পারে কি না, তার ওপর। এর জন্য বিদ্যমান অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সহায়তা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতি প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যত দৃশ্যমান হচ্ছে, ততই শুধু প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের চাপ বাড়ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতি আস্থা পুনরুদ্ধার করে কার্যকর সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে কি না, তা স্পষ্ট হবে।