মশিউর রহমান, নিউ ইয়র্ক – যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত চ্যাটবটের দেওয়া ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রযুক্তি গবেষকেরা। ভোটারদের ভুল লজিস্টিক তথ্য দেওয়া, প্রার্থীদের পরিচয় গুলিয়ে ফেলা এবং রাশিয়ার তৈরি অপপ্রচারমূলক প্রোপাগান্ডা পুনরায় ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনায় দেশের নির্বাচনী তথ্যব্যবস্থায় বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনটি (যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেন্টেস নির্বাচন) হতে যাচ্ছে মার্কিন ইতিহাসের প্রথম ফেডারেল নির্বাচন, যেখানে লাখ লাখ ভোটার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য জানার জন্য সরাসরি এআই প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছেন।
এআই মডেলগুলোর কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান ফোরাম এআই-এর (Forum AI) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নির্বাচনসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে চ্যাটবটগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশ উত্তরে অন্তত একটি করে তথ্যগত ভুল রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটবটগুলো প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্তের চেয়ে ভোট দেওয়ার নিয়মকানুন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বেশি ভুল তথ্য দিচ্ছে। অ্যানথ্রোপিকের চ্যাটবট ‘ক্লদ’ উত্তর ক্যারোলিনার প্রতিনিধি ডন ডেভিসকে ভুলবশত একজন সাবেক স্কুল সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে পরিচয় করিয়েছে।
একইভাবে, গুগলের ‘জেমিনি ৩.৬ ফ্ল্যাশ’ চ্যাটবটকে পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ডাকযোগে ভোট দেওয়ার (মেইল-ইন ব্যালট) শেষ সময় জানতে চাওয়া হলে সেটি ৩ নভেম্বরের কথা জানায়, যা প্রকৃত সময়সীমার চেয়ে এক সপ্তাহ পরের ভুল তারিখ। চ্যাটবটের এই ভুল তথ্য অনুসরণ করলে অনেক ভোটার সময়মতো ব্যালট না পেয়ে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন।
গবেষকদের আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদেশি অপপ্রচার চালানো গোষ্ঠীগুলো এআই চ্যাটবটকে প্রভাবিত করছে। অক্টোবরের শেষ দিকে এএফপির (AFP) ফ্যাক্ট-চেকাররা রাশিয়ান প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে তৈরি একটি ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত করেন, যেখানে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী জেমস তালারিকোর বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের সম্পূর্ণ বানোয়াট অভিযোগ তোলা হয়। ভুয়া তথ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘নিউজগার্ড’ বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা করতে গেলে দেখা যায় গুগলের ‘এআই ওভারভিউ’ (AI Overview), ‘জেমিনি’ এবং মাইক্রোসফটের ‘কোপাইলট’— এই তিনটি জনপ্রিয় এআই টুলই সেই মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগটি সত্য হিসেবে তাদের উত্তরে পুনরাবৃত্তি করেছে।
মাইক্রোসফট অবশ্য এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ঘটনাটি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি ছিল। পরবর্তীতে কোপাইলটকে হালনাগাদ করে তথ্যটি বানোয়াট হিসেবে সংশোধন করা হয়েছে। গুগলের পক্ষ থেকেও নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্যে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভরযোগ্য সোর্স নিশ্চিত করার দাবি করা হয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ’-এর মতে, বড় সব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাটফর্মে এআই টুল সরাসরি যুক্ত থাকা এটিই প্রথম মার্কিন নির্বাচন। তবে ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স অন সিটিজেনশিপ’-এর এক জরিপ বলছে, প্রতি ৫ জনে ২ জন আমেরিকান এআই ব্যবহার করলেও ভোট দেওয়ার সময়, স্থান ও পদ্ধতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এআইয়ের তথ্যের ওপর মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষের আস্থা রয়েছে।
অবশ্য ইতিবাচক দিক হিসেবে মার্কিন নির্দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিস’ জানিয়েছে, ভোটিং মেশিনে কারচুপির মতো বহুল প্রচলিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বিষয়ে বারবার চ্যালেঞ্জ করা হলেও জনপ্রিয় চ্যাটবটগুলো সাধারণত এসব মিথ্যা দাবির পক্ষে অবস্থান নেয়নি, যা নির্বাচনী অপতথ্য মোকাবিলায় কিছুটা হলেও আশাব্যঞ্জক।