ক্যাপিটল হিলের দখল কার? চূড়ান্ত মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে এগোচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা

শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি — আগামী ৩ নভেম্বর, ২০২৬-এর ভাগ্যনির্ধারণী মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র ৭২ ঘণ্টারও কম সময় বাকি। ঠিক এই চূড়ান্ত মুহূর্তে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লড়াই এক নজিরবিহীন উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে। ক্যাম্পেইনের একেবারে শেষভাগে এসে নাটকীয়ভাবে বড় ধরনের সুবিধা বা মোমেন্টাম পাচ্ছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এর ফলে প্রতিনিধি সভা (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সিনেট—উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই এই পরিস্থিতিকে একটি সম্ভাব্য ‘ব্লু ওয়েভ’ বা ডেমোক্র্যাটদের জয়জয়কার হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের ৪৩৫ আসনের নিম্নকক্ষ বা প্রতিনিধি সভার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা এখন সুতোর ওপর ঝুলছে। বর্তমানে রিপাবলিকানরা এই কক্ষে অত্যন্ত সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখলেও নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে তাদের বেশ কিছু দুর্গে ফাটল দেখা দিয়েছে। যেহেতু এই কক্ষের সবকটি আসনেই নির্বাচন হচ্ছে, তাই ক্ষমতার পটপরিবর্তনের গাণিতিক সমীকরণটি এবার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত।

প্রতিনিধি সভার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে ও স্পিকারের চেয়ার পুনরুদ্ধার করতে ডেমোক্র্যাটদের প্রয়োজন মাত্র ৩টি আসনের নেট জয় (Net Gain)। প্রখ্যাত ও নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশের রাজনৈতিক হাওয়া হঠাৎ করেই ডেমোক্র্যাটদের পালে বইতে শুরু করেছে। রিপাবলিকানদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ বা এগিয়ে থাকা অন্তত ১২টি আসনের সমীকরণ আচমকা পাল্টে গিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অথবা ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে চলে গেছে। অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষকরা একে রিপাবলিকানদের জন্য একটি “প্রজন্মগত বিপর্যয়” বা বড় ধাক্কার পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।

কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ তথা সিনেটেও লড়াইয়ের তীব্রতা এখন আকাশচুম্বী। ১০০ আসনের সিনেটে বর্তমানে ৫৩-৪৭ ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে রিপাবলিকানদের। এবারের চক্রে সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার ফলে ডেমোক্র্যাটদের জন্য পথটি কঠিন হলেও তারা লড়াইয়ের পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

সিনেটের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রয়োজন ৪টি আসনের নেট জয়। গত এক সপ্তাহে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী রিপাবলিকান ঘাঁটিতে চালানো জনমত জরিপে অভাবনীয় ওলটপালট দেখা গেছে। যে রাজ্যগুলোকে রিপাবলিকানদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করা হচ্ছিল, সেখানেও তাদের প্রার্থীরা এখন ডেমোক্র্যাটদের সাথে সমানে-সমানে লড়ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে রিপাবলিকানদের কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সেসব নিরাপদ রাজ্য প্রতিরক্ষায় সরাতে হচ্ছে। উপশহরীয় (Suburban) এলাকাগুলোতে ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি ডেমোক্র্যাটদের এই অভাবনীয় অগ্রযাত্রায় মূল ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচনী মাঠের এই চরম উত্তেজনা কেবল প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজোম রাজ্যের চারটি ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে একটি জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতা পাঠিয়েছেন। ভোটার তালিকায় অনাগরিকদের নিবন্ধনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় কিছু অভিযোগের পর, গভর্নর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে কেন্দ্রীয় এজেন্টরা ভোটের চূড়ান্ত সার্টিফিকেশনের আগেই ব্যালট বা ভোটিং মেশিন জব্দ করতে সার্চ ওয়ারেন্ট ব্যবহার করতে পারে। এই ধরনের যেকোনো হস্তক্ষেপ রুখতে ক্যালিফোর্নিয়া প্রশাসন আগাম আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে উভয় দলই তাদের শীর্ষ হেভিওয়েট নেতাদের নিয়ে চূড়ান্ত প্রচারণায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তবে ফেডারেল ইলেকশন কমিশন (FEC) এবং স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা ভোটারদের কেবলই প্রত্যয়িত ও যাচাইকৃত তথ্যের ওপর ভরসা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটদের এই শেষ মুহূর্তের জোয়ার ক্যাপিটল হিলের ঐতিহাসিক ক্ষমতা বদল ঘটাতে পারে কিনা, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।