শিব্বীর আহমেদ, নিউ ইয়র্ক — প্রকৃতি যখন প্রতিশোধ নিতে শুরু করে, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শহরও কতটা অসহায় হয়ে পড়তে পারে—তার নির্মম সাক্ষী নিউ ইয়র্ক। ২০১২ সালের সেই অভিশপ্ত ৪৮ ঘণ্টায় হারিকেন স্যান্ডির তাণ্ডবে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪৪ জন নিউ ইয়র্কবাসী। অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল ২০ লাখ মানুষের জীবন। আর মুহূর্তের মধ্যে ছাই হয়ে গিয়েছিল ১৯ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নিউ ইয়র্ক এবার আর প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। বরং শুরু করেছে এক অভাবনীয় ‘জলবায়ু যুদ্ধ’।
সমুদ্রের রাক্ষুসে ঢেউ আর ক্রমাগত বাড়তে থাকা পানির স্তরকে রুখে দিতে ম্যানহাটন উপকূলের বুক চিরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা) এক মহাপ্রকল্প। জাতিসংঘের এক সাম্প্রতিক সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই অতি-আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রোমাঞ্চকর বিবরণ, যা একাধারে বিজ্ঞান, স্থাপত্য এবং কোটি মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার গল্প।
পার্কের ছদ্মবেশে এক অভেদ্য দুর্গ
এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে জাদুকরী রূপ দেখা যাচ্ছে ম্যানহাটনের ঐতিহাসিক ‘ইস্ট রিভার পার্ক’ জুড়ে। উইলিয়ামসবর্গ ব্রিজের উত্তর প্রান্তে কান পাতলেই শোনা যায় বিশাল সব ক্রেন আর ভারী যন্ত্রপাতির গর্জন। নদী থেকে লাখ লাখ টন বিশেষ মাটি এনে পুরো পার্কটিকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ ফুট (৩ মিটার) উঁচুতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু যা চোখে দেখা যাচ্ছে, তা আসলে আসল সত্যের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ! মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য দানবীয় ঢাল। নদীর পাড় ঘেঁষে মাটির প্রায় ১০০ ফুট (৩০ মিটার) গভীর পর্যন্ত গেঁথে দেওয়া হয়েছে কংক্রিট ও ইস্পাতের বিশাল সব খাম্বা (পাইল), যা মাটির নিচে থাকা যেকোনো প্রাচীন জাহাজের ধ্বংসাবশেষ বা পুরনো জেটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সরাসরি পাথুরে স্তরে গিয়ে ঠেকেছে। এর ঠিক ওপরেই গড়ে তোলা হয়েছে এক অভেদ্য ফ্লাডওয়াল বা বন্যা প্রতিরোধক দেয়াল। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ বিনোদন পার্ক মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আস্ত একটি আধুনিক দুর্গ।
মহাপ্রলয়ের প্রস্তুতি: যখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে শহর!
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যৎ নয়, এটি বর্তমানের এক নির্মম বাস্তব। ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের (WMO) তথ্য বলছে, ১৯৯৩ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানির স্তর বৃদ্ধির গতি দ্বিগুণ হয়েছে। ৫২০ মাইলের দীর্ঘ উপকূলরেখা থাকা নিউ ইয়র্কের জন্য আসল ভয় এখন আর বড় কোনো সুপারস্টর্ম নয়, বরং প্রতিদিনের সাধারণ জোয়ার।
নিউ ইয়র্ক সিটির ব্যুরো অব কোস্টাল রেজিলিয়েন্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার ক্যাথরিন প্রিবিলস্কি এক হুঁশিয়ারিতে বলেন, `এই দেয়াল না থাকলে আগামী দিনগুলোতে নিউ ইয়র্কবাসীদের মাসে ১০ থেকে ১৫ বার, এমনকি প্রতিদিনও জোয়ারের পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ার মুখোমুখি হতে হতো। স্তব্ধ হয়ে যেত কর্মজীবন, বন্ধ হয়ে যেত শিশুদের স্কুলে যাওয়া।’
এই বিপদ ঠেকাতে পুরো সিস্টেমটিকে করা হয়েছে অত্যন্ত চতুর। কোনো বড় ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া মাত্রই এই পার্কে কোনো মানুষের যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। উপকূলের অন্য প্রান্তে থাকা ১৮টি বিশাল স্লাইডিং ফ্লাডগেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে এবং দক্ষিণের অংশে প্রায় ১০০টি মেকানিক্যাল ‘ফ্লিপ-আপ’ ব্যারিয়ার মাটির নিচ থেকে সটান ওপরের দিকে উঠে এসে পানির তোড় আটকে দেবে। সমুদ্রের পানি যদি আরও ৩০ ইঞ্চিও (৭৬ সেন্টিমিটার) বাড়ে, তাহলেও এই দেয়াল টপকাতে পারবে না। বর্তমানে এর ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন এবং সাময়িকভাবে যেকোনো বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় শহরটি এখন প্রস্তুত।
বৈশ্বিক বৈষম্য: ধনী শহরের বিলাসী অভিযোজন বনাম দক্ষিণ এশিয়ার কান্না
নিউ ইয়র্কের এই ২ বিলিয়ন ডলারের মহাপ্রকল্প যখন বিশ্বজুড়ে হাততালি কুড়াচ্ছে, ঠিক তখনই এটি বিশ্ব জলবায়ু রাজনীতির এক চরম ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক বৈষম্যকে নগ্ন করে দিয়েছে। জাতিসংঘ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, নিউ ইয়র্ক, মিয়ামি কিংবা চীনের গুয়াংজুর মতো ধনী মেগাসিটিগুলোর বিলিয়ন ডলার খরচ করে নিজেদের বাঁচানোর বিলাসিতা রয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার নিচু অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য সমুদ্রের এই পানির তর্জন-গর্জন সরাসরি এক ‘মৃত্যুঘণ্টা’।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থায়ীভাবে উপকূল তলিয়ে যাওয়ার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার—বিশেষ করে বাংলাদেশ (ঢাকা ও উপকূলীয় অঞ্চল) এবং ভারতের (কলকাতা ও মুম্বাই)-এর প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে চিরতরে উদ্বাস্তু হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ফিজি বা ভানুয়াতুর মতো দ্বীপ দেশগুলোর মানুষ ইতিমধ্যে তাদের আদিপুরুষের ভিটে ছেড়ে পালাতে শুরু করেছেন।

জাতিসংঘের প্রতিনিধি নাভিদ হানিফ বলেন, `নিউ ইয়র্ক যা করছে তা প্রশংসনীয় এবং অনুকরণীয়। কিন্তু একই সাথে এটি বিশ্বনেতাদের জন্য একটি বার্তা যে, অর্থায়নের অভাবে দরিদ্র দেশগুলো যেন পানির নিচে হারিয়ে না যায়।’
দেয়ালের ওপারে জীবন যেখানে স্বপ্ন বোনে
এই প্রকল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এটি পরিবেশকে ধ্বংস করে তৈরি কোনো কংক্রিটের জঙ্গল নয়। উঁচু করা এই ইস্ট রিভার পার্কের ওপর এখন বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে সবুজ ঘাসের গালিচা। তৈরি হয়েছে আধুনিক রানিং ট্র্যাক, শিশুদের খেলার মাঠ, ফুটবল খেলার মাঠ এবং বারবিকিউ স্পট। বিকেলে যখন ব্রুকলিনের আকাশ লাল করে সূর্য ডোবে, তখন স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের পোষা কুকুর নিয়ে এখানে এসে বুক ভরে শ্বাস নেন।
পার্কে হাঁটতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা লিজের ভাষায়, `আমরা প্রতিদিন এখানে আসি। মাটির নিচে কী আছে তা হয়তো আমরা রোজ ভাবি না। কিন্তু ওপরে যে সুন্দর জীবন আমরা পাচ্ছি, তা প্রমাণ করে জলবায়ুর সাথে লড়াই করেও কীভাবে জীবনকে সুন্দর রাখা যায়।’
নিউ ইয়র্ক ২০২৭ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের শতভাগ কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই প্রকল্প বিশ্ববাসীকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই মানে কেবল সমুদ্রকে ভয় পাওয়া নয়, বরং প্রকৃতিকে আলিঙ্গন করে মানুষের জীবনযাত্রাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।