শিব্বীর আহমেদ, নিউ ইয়র্ক – ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে পরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে রাশিয়া যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন। এসব হামলার কারণে লাখ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ ও উত্তাপের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, বিশেষ করে শীতের তীব্র ঠান্ডায় তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। সোমবার, ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত তদন্তের ফলাফলে কমিশন জানায়, ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস অবকাঠামো, তাপ সরবরাহব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্কে রুশ হামলার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। কমিশনের মতে, বেসামরিক স্থাপনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং এসব হামলার ফলে বেসামরিক মানুষের ওপর চরম দুর্ভোগ চাপিয়ে দেওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ সালের শীতকালে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ আটটি অঞ্চলে বিদ্যুৎ, উত্তাপ, পানি ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা মাইনাস ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে বয়স্ক মানুষ ও প্রতিবন্ধীরা ভবনের লিফট ব্যবহার করতে পারেননি এবং ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার সময় নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে সমস্যায় পড়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎচালিত চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল রোগীদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
কমিশন জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে বসবাসকারী ২৫৫ জনের অভিজ্ঞতা, সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক এবং নাগরিক সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। কমিশনের চেয়ারম্যান এরিক মোসে সতর্ক করে বলেন, শীত ঘনিয়ে আসার আগে হামলা বেড়ে যাওয়ায় বেসামরিক মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে ২৯টি দেশের পুরুষ নাগরিককে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিশন। এসব ব্যক্তির অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তিকে বেসামরিক চাকরি বা অন্য সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। পরে তাঁদের রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কমিশন এ ধরনের নিয়োগকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
রাশিয়া তদন্ত কমিশনের এখতিয়ার স্বীকার করে না এবং প্রতিবেদনটির ভিত্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। রুশ জাতিসংঘ মিশনের দাবি, কমিশনের অনুসন্ধান মিথ্যা তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। মস্কো বরাবরই বলে আসছে, তাদের সামরিক বাহিনী ইউক্রেনে সামরিক বা সামরিক-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
জাতিসংঘের এই তদন্তের ফলাফল ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বেসামরিক নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সামনে আরেকটি শীত মৌসুম আসায় ইউক্রেনের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।