শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক — বিশ্ব যখন যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্যের চাপে ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে, তখন আবারও সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—জাতিসংঘ কি সত্যিই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যকর প্রতিষ্ঠান, নাকি বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে বারবার বাধাগ্রস্ত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা? ফিলিস্তিনের গাজায় বিপুল প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর পালিত হয় জাতিসংঘ দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো।
প্রতিষ্ঠার আট দশকেরও বেশি সময় পর জাতিসংঘের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতা। সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, বড় শক্তির সামরিক পদক্ষেপ কিংবা নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হলে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। ফলে জাতিসংঘের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না, আবার এর কাঠামোগত দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অবদান হলো, এটি এমন একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ তৈরি করেছে, যেখানে ছোট-বড় সব রাষ্ট্র নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারে। সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের একটি ভোটের মূল্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা রাশিয়ার একটি ভোটের সমান। এই নীতিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সমতার ভিত্তি।
জাতিসংঘ সনদের প্রথম অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। একই সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে অন্য রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ কিংবা বলপ্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
জাতিসংঘের কার্যক্রম শুধু যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP), জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (UNHCR) এবং অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংস্থাটি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা, শিশু সুরক্ষা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর পুনর্গঠন, উন্নয়ন সহযোগিতা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তা সংগ্রহে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে আসছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও বাংলাদেশের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
অতএব, জাতিসংঘকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। বরং প্রশ্ন হলো, মানবিক ও উন্নয়নমূলক কাজে যে প্রতিষ্ঠান এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় সেটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয় কেন?
জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। এই পরিষদের ১৫টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। বাকি ১০টি রাষ্ট্র নির্দিষ্ট মেয়াদে নির্বাচিত হয়। মূল সমস্যা হলো, পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রত্যেকেরই ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের বিপক্ষে একজন স্থায়ী সদস্য ভেটো দিলে, প্রয়োজনীয় সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সেই প্রস্তাব আটকে যেতে পারে। ফলে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের বৃহত্তর মতামতও অনেক সময় পাঁচটি রাষ্ট্রের যেকোনো একটির বিরোধিতার কাছে কার্যত পরাজিত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৎকালীন ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। ধারণা ছিল, প্রধান সামরিক শক্তিগুলোকে একই কাঠামোর মধ্যে রেখে তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানো সহজ হবে। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বব্যবস্থা ১৯৪৫ সালের মতো নয়। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদে সেই পরিবর্তনের যথাযথ প্রতিফলন নেই।
এখানেই জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক বৈপরীত্য। সাধারণ পরিষদে সব রাষ্ট্রের সমান ভোটাধিকার থাকলেও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রয়েছে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে। সেখানে পাঁচটি রাষ্ট্রের বিশেষ অধিকার রয়েছে।
ফলে কোনো সংকটে একটি স্থায়ী সদস্য নিজেই জড়িত থাকলে, অথবা তার মিত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন উঠলে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়তে পারে। ভেটো ব্যবস্থার কারণে গাজা, ইউক্রেন ও ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতেও জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তবে সব অচলাবস্থার জন্য শুধু ভেটোকে দায়ী করাও যথার্থ নয়। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অনীহা, পরস্পরবিরোধী নিরাপত্তা স্বার্থ এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতার অভাবও জাতিসংঘের ক্ষমতা সীমিত করে।
ছোট দেশগুলোর জন্য জাতিসংঘের গুরুত্ব অপরিসীম। আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক আলোচনা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে একটি ছোট রাষ্ট্রও শক্তিশালী প্রতিবেশী কিংবা বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারে। জাতিসংঘ না থাকলে এমন অনেক দেশের কূটনৈতিক পরিসর আরও সীমিত হয়ে পড়ত।
কিন্তু কূটনৈতিক সমতা আর বাস্তব নিরাপত্তা এক বিষয় নয়। ধরা যাক, একটি ছোট দেশ অন্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলো। আক্রান্ত দেশটি নিরাপত্তা পরিষদে অভিযোগ জানাতে পারে, সাধারণ পরিষদে সমর্থন চাইতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাতে পারে। কিন্তু আগ্রাসন বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন কার্যকর সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক চাপ এবং তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা। নিরাপত্তা পরিষদে ভেটোর কারণে সিদ্ধান্ত আটকে গেলে আক্রান্ত দেশটির দুর্ভোগ অব্যাহত থাকতে পারে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে, জাতিসংঘ কি বড় শক্তিগুলোর প্রভাবাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে? সংস্থাটির পুরো কার্যক্রমকে কোনো একটি দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন বলা সঠিক হবে না। জাতিসংঘে শতাধিক রাষ্ট্র স্বাধীনভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে, প্রস্তাব দেয় এবং বিভিন্ন বিষয়ে জোট গঠন করে। সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটি অনেক সময় বড় শক্তিগুলোর বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক জনমত প্রকাশ করে।
তবে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো এমন যে, বড় শক্তিগুলোর বিরোধিতা উপেক্ষা করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন। তাই অধিকতর যথাযথ মূল্যায়ন হলো—জাতিসংঘ পুরোপুরি বড় শক্তিগুলোর হাতের পুতুল নয়, কিন্তু এর নিরাপত্তা কাঠামোও তাদের প্রভাবমুক্ত নয়। ছোট দেশগুলোর পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়াতে হলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাষ্ট্র বন্ধু না শত্রু, শক্তিশালী না দুর্বল—তার ভিত্তিতে নয়; বরং একই আইনি মানদণ্ডে প্রত্যেকের কর্মকাণ্ড বিচার করতে হবে।
গাজা জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক উদাহরণগুলোর একটি। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের পর গাজায় বিপুল প্রাণহানি, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামোর ধ্বংস এবং খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবার সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এই সংকটে জাতিসংঘের ভূমিকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। সংস্থাটির বিভিন্ন দপ্তর মানবিক পরিস্থিতির তথ্য সংগ্রহ, ত্রাণ সমন্বয়, খাদ্য ও চিকিৎসাসহায়তা প্রদান, শিশুদের সুরক্ষা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। জাতিসংঘের কর্মীরা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
একই সঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার ও মানবিক সংস্থাগুলো বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। কিন্তু এসব প্রচেষ্টা একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি: মানুষের জীবন রক্ষার আহ্বান জানানো সম্ভব হলেও, সেই জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন?
জাতিসংঘ ত্রাণ দিতে পারে, পরিস্থিতির প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে, যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিবদ্ধ করতে পারে। কিন্তু সংঘাতের পক্ষগুলোকে বাধ্য করার মতো ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না থাকলে এসব প্রচেষ্টার কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে।
নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং ভেটো ব্যবহারের ইতিহাস এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। সমালোচকদের মতে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নে নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা জাতিসংঘের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার সমর্থকেরা নিরাপত্তা, জিম্মিদের মুক্তি এবং হামাসের ভূমিকার মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে কোনো পক্ষের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগই বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতাকে বাতিল করে না। জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা এখানেই যে, নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সংস্থাটির হাতে স্বাধীন কোনো বিশ্বসেনাবাহিনী নেই। শান্তিরক্ষা মিশনও সাধারণত নির্দিষ্ট ম্যান্ডেট, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা ও রাজনৈতিক সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। গাজার অভিজ্ঞতা তাই দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিন্দা ও মানবিক তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর প্রয়োগব্যবস্থার বিকল্প নেই।
২০২৬ সালে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরানের পাল্টা হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে সামরিক হামলার নিন্দা জানান। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অবিলম্বে সংঘর্ষ বন্ধ, উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান।
এই প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাতিসংঘ সংঘাতের শুরুতেই আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ, আত্মরক্ষার অধিকার এবং সামরিক অভিযানের বৈধতা—এসব প্রশ্নের উত্তর আবেগ বা রাজনৈতিক প্রচারণা দিয়ে নয়, প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইন ও নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হয়। কিন্তু মহাসচিবের বিবৃতি যুদ্ধ থামানোর নিশ্চয়তা দেয় না। সামরিক অভিযান বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক চাপ এবং প্রয়োজনে নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমুজ প্রণালি নিয়েও নিরাপত্তা পরিষদে মতবিরোধ দেখা গেছে। ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল রাশিয়া ও চীন প্রণালিটির বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বাহরাইনের উত্থাপিত একটি প্রস্তাবে ভেটো দেয়। রয়টার্স ও আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১১টি রাষ্ট্র প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে সেটি গৃহীত হয়নি; দুটি রাষ্ট্র ভোটদানে বিরত ছিল।
এ ঘটনায় জাতিসংঘের কাঠামোগত সমস্যাটি স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ নিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন থাকলেও স্থায়ী সদস্যদের বিরোধিতা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
ইরান সংকটের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কার্যকারিতা তাই দুইভাবে বিচার করা প্রয়োজন। প্রথমত, সংস্থাটি কি কূটনৈতিক আলোচনা, আন্তর্জাতিক আইন এবং উত্তেজনা প্রশমনের মঞ্চ হিসেবে কাজ করছে? হ্যাঁ, করছে। দ্বিতীয়ত, সংস্থাটি কি সংঘাতের পক্ষগুলোকে কার্যকরভাবে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারছে? এখানে তার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। তবে জাতিসংঘের ব্যর্থতাকে শুধু মহাসচিব বা সংস্থার কর্মীদের ব্যর্থতা বলা যাবে না। সদস্যরাষ্ট্রগুলো নিজেরাই যদি সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থকে আন্তর্জাতিক সমঝোতার ওপরে স্থান দেয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। গাজা ও ইরান ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতে জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো সংকটেও স্থায়ী সদস্যদের পারস্পরিক বিরোধ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতার আরেকটি দিক হলো, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ। কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রুত নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর কূটনৈতিক চাপ তৈরি হলেও অন্য কোনো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় না—এমন ধারণা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল করে।
এ ছাড়া সংস্থাটির বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, পর্যাপ্ত অর্থায়নের সংকট, শান্তিরক্ষা মিশনের সীমিত ক্ষমতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার অসুবিধাও রয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার: জাতিসংঘ কোনো বিশ্বসরকার নয়। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মতি ও সহযোগিতা ছাড়া এটি সব আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। তাই প্রত্যাশা ও বাস্তব ক্ষমতার মধ্যে ব্যবধানও ব্যর্থতার অনুভূতিকে বাড়িয়ে তোলে।
জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করতে হলে শুধু বার্ষিক সম্মেলন, বিবৃতি কিংবা নতুন প্রস্তাব যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো, জবাবদিহি এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে বাস্তব পরিবর্তন। প্রথমত, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার করতে হবে। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি। স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নির্বাচিত সদস্যদের কার্যকর ভূমিকা বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, ভেটো ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। গণহত্যা, ব্যাপক যুদ্ধাপরাধ বা গুরুতর মানবিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতিতে ভেটো ব্যবহারের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কার্যকর সমঝোতা দরকার। এ ধরনের সংস্কারের জন্য জাতিসংঘ সনদ সংশোধনসহ জটিল আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন হতে পারে। তাই কেবল আহ্বান নয়, বাস্তব আলোচনাও জরুরি।
তৃতীয়ত, সাধারণ পরিষদের ভূমিকা শক্তিশালী করতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদ ভেটোর কারণে অচল হয়ে পড়লে সাধারণ পরিষদ জরুরি অধিবেশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠিত করতে পারে এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর জন্য সুপারিশ দিতে পারে। তবে সাধারণ পরিষদের সুপারিশ ও নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তের আইনি পার্থক্য বজায় রেখেই এই ক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাষ্ট্রের সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি যেন তার দায়বদ্ধতা এড়ানোর সুযোগ না হয়। বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ, মানবিক সহায়তা আটকে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রমাণ, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং উপযুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। গাজা, সুদানসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, আশ্রয় ও জরুরি সেবার সরবরাহ যেন রাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
ষষ্ঠত, ছোট রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে আঞ্চলিক জোট, আন্তর্জাতিক আইন এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতির মাধ্যমে সম্মিলিত অবস্থান গড়ে তুলতে হবে। ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিরাপত্তা পরিষদে প্রবেশাধিকার, আলোচনায় অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
সপ্তমত, জাতিসংঘের নিজস্ব জবাবদিহি বাড়াতে হবে। শান্তিরক্ষা মিশন, মানবিক সহায়তা, অর্থ ব্যয় এবং কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। জনগণের অর্থে পরিচালিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘকে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট হিসাব দিতে হবে।
বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতিসংঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। সংস্থাটি সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, মহামারি মোকাবিলা, টিকাদান কর্মসূচি, স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক তথ্য বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বকে দেখিয়েছে, কোনো একটি দেশের স্বাস্থ্যসংকট দ্রুত বৈশ্বিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। কিন্তু মহামারির সময় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ঘাটতি, টিকা ও চিকিৎসাসামগ্রী বণ্টনে বৈষম্য এবং ধনী দেশগুলোর নিজস্ব অগ্রাধিকার বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।
এখানে জাতিসংঘের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জরুরি ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে হাসপাতাল, চিকিৎসাকর্মী ও রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
গাজার মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর বিপর্যয় দেখিয়েছে, মানবিক সহায়তার আহ্বান জানানো এবং বাস্তবে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। একইভাবে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অপুষ্টি এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
ভবিষ্যতে জাতিসংঘকে একটি কার্যকর বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে জরুরি স্বাস্থ্য তহবিল বাড়ানো, ওষুধ ও টিকার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা, মহামারির আগাম সতর্কতা জোরদার করা এবং যুদ্ধের সময় চিকিৎসা অবকাঠামোর সুরক্ষায় আরও কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, স্যাটেলাইট ছবি পর্যবেক্ষণ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, ড্রোন পরিচালনা, সাইবার হামলা এবং সামরিক পরিকল্পনায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এর ফলে সামরিক বাহিনী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, কিন্তু একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের জীবন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং যুদ্ধের নৈতিকতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রাণঘাতী স্বায়ত্তশাসিত অস্ত্রব্যবস্থা—যে ব্যবস্থায় মানুষের সরাসরি নির্দেশ ছাড়াই কোনো লক্ষ্য নির্বাচন ও আক্রমণ করার ক্ষমতা থাকতে পারে। এ ধরনের অস্ত্রের ক্ষেত্রে ভুল শনাক্তকরণ, পক্ষপাতদুষ্ট অ্যালগরিদম, প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা অনিয়ন্ত্রিত আক্রমণ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
যুদ্ধের ময়দানে এআই যদি ভুল করে কোনো হাসপাতাল, স্কুল বা বেসামরিক স্থাপনাকে সামরিক লক্ষ্য হিসেবে শনাক্ত করে, তাহলে দায় কার—প্রযুক্তি নির্মাতা, সামরিক কমান্ডার, অস্ত্র পরিচালনাকারী, নাকি রাষ্ট্রের? এই প্রশ্নের উত্তর আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে স্পষ্ট করা জরুরি।
জাতিসংঘ ইতিমধ্যে প্রাণঘাতী স্বায়ত্তশাসিত অস্ত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা ও নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় যুক্ত রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের তুলনায় আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। বিশেষ করে বড় সামরিক শক্তিগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য নতুন আন্তর্জাতিক চুক্তি গ্রহণের পথে বাধা তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতে জাতিসংঘের করণীয় হওয়া উচিত প্রাণঘাতী অস্ত্রব্যবস্থায় মানুষের অর্থবহ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক নীতি প্রতিষ্ঠা করা। বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা, নির্বিচার হামলা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমাতে বাধ্যতামূলক নিয়ম প্রণয়ন করতে হবে। এআই-নির্ভর সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাইবার হামলা, ভুয়া তথ্য ছড়ানো ও সংঘাত উসকে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোও জরুরি। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে সামরিক এআই নিয়ন্ত্রণের বৈশ্বিক আলোচনায় তাদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত না হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের সব ব্যবহার একই ধরনের নয়। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ বা প্রতিরক্ষামূলক সাইবার নিরাপত্তায় এআই ব্যবহার এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রাণঘাতী আক্রমণ চালানো এক বিষয় নয়। তাই কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রযুক্তির ধরন, ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য মানবিক ক্ষতির ভিত্তিতে পৃথক নীতিমালা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং এআইনির্ভর যুদ্ধকে আলাদা বিষয় মনে হলেও, দুটির মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে না; সাইবার হামলা, হাসপাতালের ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ, স্বাস্থ্যতথ্য চুরি এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে এআই রোগ শনাক্তকরণ, মহামারির পূর্বাভাস, চিকিৎসা গবেষণা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ যে প্রযুক্তি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে সেটিই জীবননাশের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। জাতিসংঘের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব রয়েছে—প্রযুক্তির মানবকল্যাণমূলক ব্যবহার উৎসাহিত করা এবং তার সামরিক অপব্যবহার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা।
মূল প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির অগ্রগতি কি মানবতার নিরাপত্তা বাড়াবে, নাকি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর হাতে আরও বিধ্বংসী অস্ত্র তুলে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কার্যকর আইন এবং রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
জাতিসংঘ দিবস কেবল একটি প্রতিষ্ঠার বার্ষিকী নয়; এটি বিশ্বব্যবস্থার নৈতিকতা ও কার্যকারিতা পর্যালোচনার দিন। আট দশকের বেশি সময় ধরে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উন্নয়ন ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কিন্তু গাজা ও ইরানসহ বিভিন্ন সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বশান্তি রক্ষার প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি সব সময় কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
এর মূল কারণ শুধু জাতিসংঘের প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; বরং ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, ভেটো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। যে ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটিই অনেক সময় শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তবু জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে এমন কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যেখানে ছোট-বড় সব রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার জন্য একই রকম বিস্তৃত কাঠামো রয়েছে।
তাই সমাধান জাতিসংঘকে অকার্যকর ঘোষণা করে পরিত্যাগ করা নয়; বরং তাকে আরও গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, ভেটোর অপব্যবহার রোধ, আন্তর্জাতিক আইনের সমান প্রয়োগ এবং মানবিক বিপর্যয়ে দ্রুত পদক্ষেপ—এসব ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে।
সবশেষে প্রশ্নটি জাতিসংঘের অস্তিত্ব নিয়ে নয়, বরং তার মূল অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নিয়ে। যদি একটি শিশুর জীবন রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে, যদি একটি ছোট রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর আন্তর্জাতিক সহায়তা না পায়, আর যদি যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের স্বার্থে বারবার থেমে যায়—তাহলে বিশ্বশান্তির প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজেই থেকে যাবে।
জাতিসংঘ দিবসে বিশ্বের নেতাদের সামনে তাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সুবিধা অনুযায়ী নয়, বরং সব মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে কার্যকর করা। জাতিসংঘ তখনই সত্যিকারের সফল হবে, যখন দুর্বল রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বরও শক্তিশালী রাষ্ট্রের মতো গুরুত্ব পাবে এবং বিশ্বশান্তি আর শুধু কূটনৈতিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।
— কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক, জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক।