প্যারিসের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ, ট্রাম্পের দিকে মাখোঁর কটাক্ষ

ঢাকা: ফ্রান্সে আবারও বিক্ষোভের আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ। কয়েক দিন আগে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিক্ষোভ ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়। গত কয়েক বছরের মধ্যে সেটি ছিল দেশটির অন্যতম ভয়াবহ সড়ক সহিংসতার ঘটনা। বুধবার এ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কটাক্ষ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে ট্রাম্প ফ্রান্সের দাঙ্গাকে কাজে লাগাচ্ছেন বলে মাখোঁ ইঙ্গিত করেন।

প্যারিসে স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। ফরাসি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলিসি প্রাসাদ, পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ ও পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান লুভর জাদুঘর ও শঁজেলিজে সড়ক। এ ছাড়া বাস্তিল ও রিপাবলিক চত্বর এবং শাতলে-লে আল শপিং এলাকাসহ আরও কয়েকটি স্থানে সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত সপ্তাহের শেষে এসব এলাকায় ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়।

গত সপ্তাহের শেষে মুখোশধারী তরুণদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও সরকারি ভবনে ভাঙচুরের ঘটনায় সৃষ্ট সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার কথা স্বীকার করেছে ফ্রান্স। দেশটির সরকার বলেছে, ওই পরিস্থিতিতে তারা ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল।’

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে আর ছয় মাস বাকি। এর মধ্যে সহিংসতা ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষতি করেছে ও আর্থিক বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাওয়া মাখোঁ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ট্রাম্প ও সম্ভবত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা পেতে ‘বোকামিপূর্ণ মন্তব্য’ করেছেন। নেতানিয়াহুও বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারে রয়েছেন। দোহায় মাখোঁ সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছু মানুষ ফ্রান্সের ক্ষতিকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। তারা এমন নেতা, যারা নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত— এই অঞ্চলে হোক কিংবা আটলান্টিকের ওপারে।’

যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান দলের পক্ষে প্রচারণা চালানোর সময় ট্রাম্প ফ্রান্সের অস্থিরতার সঙ্গে ‘অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের’ যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। এ সময় তিনি অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যকে সামনে আনেন। মঙ্গলবার তিনি ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরিন ল্য পেনেরও প্রশংসা করেন। ল্য পেনের সঙ্গে ট্রাম্পের মতাদর্শগত মিল রয়েছে। বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মাখোঁর মন্তব্যকে ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে আখ্যা দেন ল্য পেন।

২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা এই কট্টর ডানপন্থী প্রার্থী বলেন, ‘গত শনিবার আমরা যে দৃশ্য দেখেছি, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নয়। মাখোঁর ১০ বছরের শাসনের পর ফ্রান্সের বাস্তব অবস্থা এসব দৃশ্যে ফুটে উঠেছে। এটি দুঃখজনক বাস্তবতা।’ বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক ফ্রান্সের বিক্ষোভের জন্য অভিবাসীদের দায়ী করার দাবি নাকচ করেছেন।

শনিবার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের বিক্ষোভের আড়ালে পড়ে যায় চলমান সহিংসতা। এর আগে টানা চার সপ্তাহ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ফ্রান্সের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই দাঙ্গার পর ও শনিবার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে নতুন বিক্ষোভের আগে মাখোঁর সরকার সতর্ক করে বলেছে, আর কোনো সহিংসতা বরদাশত করা হবে না।

প্যারিস ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিওঁতে উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিকল্পিত নতুন বিক্ষোভও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বুধবার প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নুর সঙ্গে বৈঠকের পর ফ্রান্সের কট্টরপন্থী শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটির নেতা সোফি বিনে বিক্ষোভের ‘নতুন পর্যায়’ শুরুর আহ্বান জানান। আগামী মাসের শুরুতে ধর্মঘটেরও ডাক দেন তিনি।

বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ বুধবার জানান, বিক্ষোভ চলাকালে ও পরে আটক হওয়া ২ হাজার ৫০০ জনের মধ্যে ১৭৪ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আরও ৯১৭ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ফ্রান্সে এই অস্থিরতা আর্থিক বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দেশটির ক্রমবর্ধমান ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে আগে থেকেই বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন। বুধবার ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের মুনাফার হার ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। দেশটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফা দাবি করছেন।