পাহাড় কাটা ও দখলে হুমকির মুখে লালমাই পাহাড়, বিপন্ন প্রত্নসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য

কুমিল্লা, বাংলাদেশ: নির্বিচারে পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও ভূমি দখলের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়শ্রেণি। প্রাচীন বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকাকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) অভিযান এবং জরিমানা সত্ত্বেও পাহাড়ের মাটি কাটা ও গাছপালা ধ্বংসের ঘটনা বিভিন্ন স্থানে অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে নজরদারি এবং আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুমিল্লা শহরের প্রায় নয় কিলোমিটার পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত লালমাই-ময়নামতি পাহাড়শ্রেণির আয়তন প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ২০১৫ সালের একটি প্রকাশনা অনুযায়ী, পাহাড়গুলোর সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় ৫৫ মিটার এবং গড় উচ্চতা ২১ মিটার। পাহাড়শ্রেণির উত্তর প্রান্তে রয়েছে রানী ময়নামতির প্রাসাদ এবং দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত প্রাচীন চণ্ডীমুড়া মন্দির।

এলাকাটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল। এখানে অন্তত ছয়টি রাজবংশ ও ৩৪ জন রাজার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে। ১৯৫৫ সালে এখানে নিয়মিত প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ শুরু হয়। এরপর এ পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে শালবন বিহার, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, আনন্দ বিহার, কোটিলা মুড়া ও চারপত্র মুড়া। এ ছাড়া রয়েছে রানী ময়নামতির প্রাসাদ এবং চণ্ডীমুড়া মন্দির।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, পাহাড়জুড়ে বিভিন্ন স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। খননকাজের সময় প্রতিবছরই নতুন নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বিচারে পাহাড় কাটা ও স্থাপনা নির্মাণের ফলে এখনো আবিষ্কৃত হয়নি এমন প্রত্নসম্পদও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এতে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০০৬ সালে ৫০ একর পাহাড়ি জমিতে কার্যক্রম শুরু করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের জন্য ২০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ১৩১ একর জমি পাহাড় ও টিলা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। সেখানে বর্তমানে কয়েকটি ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।

কুমিল্লায় পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সালমান চৌধুরী শাওন জানান, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বড় ভবন পরিদর্শন করেছেন। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে তাঁর কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) প্রতিবেদন ছাড়াই ভবন নির্মাণের কাজ এগিয়েছে। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে একটি আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো অনুমোদন পাওয়া যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শহিদুল হাসান বলেন, পাহাড়ি জমিতে ভবন নির্মাণের অনুমতি চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করেছে। অনুমোদনের বিষয়টি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর, সালমানপুর ও জামমুড়া এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। এসব এলাকায় রিসোর্ট, বিনোদনকেন্দ্র ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ২০২১ সালে বড় ধর্মপুরে ১৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের সময় এক লাখ ১৪ হাজার ঘনফুটের বেশি পাহাড়ি মাটি কাটার অভিযোগে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করে।

এলাকাটিতে প্রস্তাবিত পর্যটন পার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন নির্মাণের জন্য একটি পাহাড়ের চারপাশে স্টিলের বেড়া দেওয়া হয়েছে। কাছাকাছি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছপালাও একটি চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারণে পরিষ্কার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ময়নামতি জাদুঘরের কাছে নীলকুঞ্জ ও কাশবন নামে দুটি রিসোর্ট প্রায় এক দশক ধরে চালু রয়েছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটা হয়েছিল বলে তাঁদের অভিযোগ।

সালমানপুরে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে ২০১৯ সালে ম্যাজিক প্যারাডাইস বিনোদন পার্কের নির্মাণকাজ শুরু হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের কারণে প্রায় ৫০ একর পাহাড়ি বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া জামমুড়া এলাকায় পাহাড় কাটার পর একটি ডাইনোসর পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে আরও পাহাড় সমতল করার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে লালমাই পাহাড়ের পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একসময় ঘন গাছপালা, বাঁশঝাড় ও বুনো লতাগুল্মে আচ্ছাদিত এই পাহাড়ে বন্য শূকর, মেছোবাঘ, শিয়াল, হনুমান, সজারু ও খরগোশসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর বিচরণ ছিল। পাশাপাশি অসংখ্য প্রজাতির পাখিরও আবাসস্থল ছিল এলাকাটি। কিন্তু নির্বিচারে পাহাড় কাটা, গাছপালা পরিষ্কার এবং বসতি সম্প্রসারণের কারণে এসব প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি লালমাই পাহাড়সহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় সমতল করাসহ ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। নির্দেশনার আওতায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কসহ কয়েকটি পক্ষ ছিল।

কুমিল্লার সামাজিক বনায়ন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুননাহার বলেন, পাহাড়ের দখল হয়ে যাওয়া বনভূমি পুনরুদ্ধারে কাজ করছে বন বিভাগ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলে থাকা তিন একর জমি নিয়ে একটি আইনি মামলা চলমান রয়েছে বলেও তিনি জানান।

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এ বি এম মোশিউজ্জামান বলেন, পাহাড়গুলোর অধিকাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তিনি বলেন, পাহাড় কাটার খবর পাওয়া গেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে পাহাড় সমতল করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলেও তিনি দাবি করেন।

পরিবেশবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, লালমাই-ময়নামতি পাহাড় রক্ষায় শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। নিয়মিত নজরদারি, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাঁদের মতে, এই পাহাড় সংরক্ষণ করা জরুরি শুধু জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য নয়, বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্যও। কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা না গেলে লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।