শিব্বীর আহমেদ, নিউ ইয়র্ক – বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ ফুটবল সুপারস্টার ক্যাভান সুলিভানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাড়ছে আলোচনা। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই পেশাদার ফুটবলে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এই মিডফিল্ডার। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক ও গোল করার পর তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে তাঁর সম্ভাব্য যোগদান নিয়েও চলছে আলোচনা।
তবে সুলিভান এখনো ম্যানচেস্টার সিটির খেলোয়াড় নন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ক্লাব ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে খেলছেন। বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী, ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফুটবল সাংবাদিক টম বোগার্টও জানান, নির্ধারিত সময়ে সুলিভানের সিটিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসেনি। তবে ভবিষ্যৎ দলবদলটি এখনো বাস্তবে সম্পন্ন হয়নি।
২০০৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় জন্ম ক্যাভান সুলিভানের। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি আগ্রহ এবং অসাধারণ কারিগরি দক্ষতার কারণে অল্প বয়সেই নজরে আসেন তিনি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ২০২৪ সালে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের প্রথম দলের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তাঁর। একই বছরের মে মাসে ক্লাবটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন সুলিভান। সে সময় তিনি মেজর লিগ সকারের ইতিহাসে অন্যতম কম বয়সে প্রথম দলের চুক্তি পাওয়া খেলোয়াড় হিসেবে আলোচনায় আসেন।
মাঠে সুলিভানের প্রধান শক্তি বল নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আক্রমণ তৈরির দক্ষতা। মিডফিল্ডে খেললেও প্রয়োজনে আক্রমণভাগের দুই পাশেও খেলতে পারেন তিনি। বয়সের তুলনায় তাঁর আত্মবিশ্বাস ও খেলার পরিপক্বতা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ ফুটবলার হিসেবে পরিচিত করেছে।

সুলিভানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে তাঁর ভবিষ্যৎ চুক্তির পরিকল্পনা। ২০২৪ সালে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তির সময়ই ইংলিশ ক্লাবটিতে তাঁর ভবিষ্যৎ যোগদানের ব্যবস্থা করা হয়। তবে বয়সসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দলবদলের নিয়মের কারণে এখনই ইংল্যান্ডে গিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলা সম্ভব নয়। সুলিভান ২০২৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ১৮ বছরে পা দেবেন। এ কারণে তাঁর ইংল্যান্ডে যাওয়ার সম্ভাব্য সময় হিসেবে ২০২৮ সালের জানুয়ারিকে উল্লেখ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ম্যানচেস্টার সিটির আর্থিক নিয়মসংক্রান্ত মামলার প্রেক্ষাপটে। এ পরিস্থিতিতে অন্য ইউরোপীয় ক্লাবও তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখাতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের অক্টোবরের শুরুতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সিটিতে যোগদানের পরিকল্পনা বহাল রয়েছে। বর্তমানে তিনি ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের খেলোয়াড়; সিটিতে তাঁর যোগদান ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
ক্লাব ফুটবলে ভালো পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র জাতীয় দলে প্রথমবার ডাক পান সুলিভান। এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর পেরুর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে অভিষেক হয় তাঁর। এর কয়েক দিন পর, ৩ অক্টোবর মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচে গোল করে নতুন ইতিহাস গড়েন এই তরুণ। ১৭ বছর পূর্ণ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন পর করা ওই গোলের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে পরিচিতি পান।
জাতীয় দলে এত অল্প বয়সে অভিষেক এবং গোল করার ঘটনা তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা আরও বাড়িয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে নিয়মিত পারফরম্যান্স, অভিজ্ঞতা এবং ধারাবাহিক উন্নতির ওপর।
ক্যাভান সুলিভানের পরিচয়ের একটি বিশেষ দিক হলো তাঁর পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মাতামহী সুলতানা আলমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুলতানা আলমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জার্মান বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ক্লাউস ক্রিপেনডর্ফ। তাঁদের মেয়ে হাইকে ক্রিপেনডর্ফ ক্যাভানের মা। এই পারিবারিক সূত্রেই ক্যাভানের মধ্যে বাংলাদেশি ও জার্মান—দুই ধরনের বংশগত পরিচয় রয়েছে। তবে তাঁর জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে এবং তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারও এখানেই গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল পারিবারিক পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর দুই যমজ বড় ভাই রোনান সুলিভান ও ডেকলান সুলিভান বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। ২০২৬ সালের সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের শিরোপাজয়ী দলের সঙ্গেও তাঁদের সম্পৃক্ততা ছিল। রোনান পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে দুটি গোল করেন এবং ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে টাইব্রেকারে বাংলাদেশের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একই পরিবারের তিন ভাইয়ের আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই দেশের প্রতিনিধিত্বের ঘটনা সুলিভান পরিবারকে বিশেষভাবে আলোচনায় এনেছে।

পারিবারিক সূত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগসূত্র থাকায় ক্যাভান সুলিভানের বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তাঁর আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের বর্তমান অবস্থান আলাদা।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকের পর তিনি অক্টোবরের শুরুতে সেই দলের হয়ে গোলও করেছেন। ফলে বাংলাদেশের হয়ে ভবিষ্যতে খেলার সম্ভাবনা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ফিফার জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিক দল পরিবর্তনের বিধি এবং তাঁর নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ম্যাচের অবস্থান বিবেচনা করা জরুরি। শুধু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হলেই বাংলাদেশের জাতীয় দলে খেলার অধিকার নিশ্চিত হয় না।
ক্যাভান সুলিভানের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য—ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে নিজের উন্নতি অব্যাহত রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে জায়গা শক্ত করা। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিতে পারলে ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পাবেন তিনি।
তবে বড় ক্লাবে যোগ দেওয়াই সাফল্যের শেষ কথা নয়। নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়া, শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হবে তাঁর ক্যারিয়ারের পরবর্তী বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশি পারিবারিক শিকড়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে দ্রুত উত্থান এবং ম্যানচেস্টার সিটিতে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে ক্যাভান সুলিভান এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের নজরকাড়া তরুণ প্রতিভাদের একজন।