দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ উদ্বিগ্ন: থামানো যাচ্ছে না ‘মব’ সহিংসতা

সরকারের কঠোর বার্তা, সেনাপ্রধানের হুঁশিয়ারির পরও থামানো যাচ্ছে না ‘মব’ সহিংসতা। মবের কারণে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ উদ্বিগ্ন বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গত ছয় মাসে ২৩০টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আর বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৩ মাসে ২২০ জন নিহত হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার কুমিল্লার হোমনায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হাত মাইকে ঘোষণা দিয়ে কফিল উদ্দিন শাহর মাজার ও দরগায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরা পাগলার দরবার শরিফে দফায় দফায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় রাসেল মোল্লা (২৮) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া শরীয়তপুরিপন্থি হিসেবে দাফনের অভিযোগ তুলে নুরা পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে রাস্তায় এনে পুড়িয়ে দেয় একদল জনতা। এই দীর্ঘ সময় ধরে এমন সহিংসতা চললেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খুব বেশি ভূমিকা দেখা যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, মৃতদেহ কবর থেকে তুলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলাকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি সমাজে বিদ্যমান নৈতিক অবক্ষয়, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং সহিংস জনমতের উত্থানের উদ্বেগজনক চিহ্ন হিসেবে চিহ্নিত। এই ধরনের ঘটনা গোটা মানব জাতির মর্যাদার বিরুদ্ধে আঘাত। এই অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যদি কঠোর অবস্থান না নেয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলার প্রতি জনগণের আস্থা আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। সামাজিক শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখতে সরকারকে কঠোর হতে হবে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে টাঙ্গাইলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায় একদল মুখোশধারী। দেশে মব সহিংসতা বা সংঘবদ্ধ অপরাধ বা গণপিটুনি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রতিনিয়তই কোথাও না কোথাও এই সহিংসতায় প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে। মব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন পুলিশ, শিক্ষক থেকে শুরু করে চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারী ছাড়াও সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। বাদ যাচ্ছেন না বিদেশিরাও। বাসা-বাড়িতে লোকজন ঢুকে সবকিছু তছনছ করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব সন্ত্রাসী নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন ‘তৌহিদি জনতা’। ফলে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ।

সম্প্রতি ভয়েস ফর রিফর্ম ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, মব সহিংসতার ঘটনা নিয়ে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ উদ্বিগ্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও ঢিলেঢালা মনোভাবের সুযোগে একদল জনতা মব তৈরি করছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া মবের সুযোগ নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে অন্যায় স্বার্থ হাসিল করছে বিভিন্ন গোষ্ঠী।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, আইন অবজ্ঞা করে মব সহিংসতার মাধ্যমে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি এবং ভয়াবহ পরিবেশ তৈরিতে জড়িত অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ধরনের ঘটনা প্রচলিত আইন, সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অগ্রহণযোগ্য।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত গত ১৩ মাসে দেশে অন্তত ২২০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এ ছাড়া মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত গত ছয় মাসে দেশে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ২৩০টি। এতে নিহত হয়েছেন ৭৯ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ২৬৫ জন। এর মধ্যে মার্চ মাসে ৩৯টি মব সহিংসতায় ১৩ জন নিহত হয়েছেন।

আসকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২৮ জন। ২০২৩ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিলেন ৫১ জন, ২০২২ সালে ৩৬ জন, ২০২১ সালে ২৮ জন এবং ২০২০ সালে ৩৫ জন।

ভয়েস ফর রিফর্ম ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) পরিচালিত এক সমীক্ষার ফলাফলে জানা গেছে, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। জরিপে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম, জনগণের সংস্কার প্রত্যাশা এবং আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর জনসমর্থন বিষয়ে মতামত নেওয়া হয়। সমীক্ষায় দেখা যায়, নারীর নিরাপত্তা, রাতে চলাচলের নিরাপত্তা এবং পোশাক নিয়ে হয়রানি নিয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। ফলাফলে বলা হয়, সার্বিকভাবে মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগে ৮০ শতাংশ, নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে ৫৬ শতাংশ, রাতে চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে ৬১ শতাংশ মানুষ।

গত ৩১ আগস্ট ভোররাতে নাটোর সদর উপজেলার নেপালদীঘি গ্রামে চোর সন্দেহে নবীর আলী নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গত ২৪ আগস্ট পটুয়াখালীর বাউফলে ডাকাতির পর পালাতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের পিটুনিতে উজ্জল মোল্লা নামে একজন নিহত হন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে সেটা স্বীকারও করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এতদিন যেমন ছিল, সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনায় আমি বলব, সেটা কিছুটা খারাপের দিকে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি, যাতে দ্রুতই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর নোয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকার সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও বহিরাগতদের দিয়ে শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর প্রধান শিক্ষকের অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি করেছে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। গত ১৮ আগস্ট সাতক্ষীরার বল্লী মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ঢুকে সহকারী শিক্ষক শফিকুর রহমানকে মারধর করে বাজারে ঘোরানো হয়। এই ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির ও ছাত্রদলের আট নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাতনামা আরো পাঁচ-ছয় জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গত ১২ জানুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে চাঁদা না পেয়ে বিদ্যালয় থেকে ধরে এনে শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। তাকে রক্ষা করতে গেলে কয়েক জনকে পিটিয়ে জখম করা হয়। গত ২১ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়ায় হাইদগাঁও উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি দে’র ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। শিক্ষক শ্যামল কান্তি দে বলেন, বিদ্যালয়ের সভাপতি নিয়োগকে কেন্দ্র করে এলাকার একটি প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল। তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে হামলা করে।