নিউইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচন: এগিয়ে জোহরান মামদানি

নিউইয়র্ক সিটির আসন্ন মেয়র নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা প্রতিদিনই বাড়ছে। শহরের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন প্রায় এক যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের এ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারি থেকে বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে আছেন জোহরান মামদানি। অন্যদিকে বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস এবং সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ে রয়েছেন। রিপাবলিকানদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন কার্টিস স্লিওয়া। জনমত জরিপে বারবারই প্রমাণিত হয়েছে, মামদানি এখনো পর্যন্ত অন্য সব প্রার্থীর তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে আছেন।

তবে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক কৌশলও ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, এরিক অ্যাডামস এবং অ্যান্ড্রু কুয়োমোর ভোট প্রায় একই শ্রেণির সমর্থকের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ফলে দুজন একসঙ্গে থাকলে মামদানিকে ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠবে। এই কারণেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে—যদি এ দুই প্রার্থীর একজন সরে দাঁড়ান, তবে মামদানির অগ্রযাত্রায় অন্তত কিছুটা বাধা তৈরি হতে পারে। তবে এখনো পর্যন্ত এরকম কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

মাত্র ৩৩ বছর বয়সী জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য হিসেবে উদারনৈতিক রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, ঘণ্টায় ৩০ ডলার ন্যূনতম মজুরি, উচ্চ আয়ের মানুষের উপর বাড়তি কর আরোপসহ নানা প্রগতিশীল ইস্যু নিয়ে তার প্রচারণা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিপুল সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে তার দক্ষ ব্যবহার এবং তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে অন্য প্রার্থীদের চেয়ে আলাদা করেছে। সাম্প্রতিক কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে দেখা যাচ্ছে, মামদানি পেয়েছেন ৪৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থন, কুয়োমো ২৩ শতাংশ, রিপাবলিকান প্রার্থী স্লিওয়া ১৫ শতাংশ এবং অ্যাডামস মাত্র ১২ শতাংশে ঠেকেছেন। জরিপ যে সবসময় সঠিক ফলাফল দেয় না তা আমেরিকান রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, তবে জরিপের ইঙ্গিত অগ্রাহ্য করারও সুযোগ নেই।

এরিক অ্যাডামস বর্তমান মেয়র হিসেবে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগসহ একাধিক বিতর্ক তার প্রচারণাকে দুর্বল করে তুলছে। অন্যদিকে অ্যান্ড্রু কুয়োমো, যিনি একসময় রাজনীতির প্রধান মুখ ছিলেন, তিনিও এই নির্বাচনে স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে ফিরেছেন। তবে তার অতীতের বিতর্কিত অধ্যায় এখনও তাকে পিছু ছাড়ছে না। এ দুজনের উপস্থিতি ডেমোক্র্যাট শিবিরের ভেতরে বিভক্তির চিত্রকে আরও স্পষ্ট করছে।

রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে কার্টিস প্রচারণায় নামলেও নিউইয়র্ক সিটির বাস্তবতায় তার সম্ভাবনা খুব সীমিত। তিনি নিরাপত্তা জোরদার এবং কঠোর আইন-শৃঙ্খলার পক্ষে বক্তব্য রাখলেও প্রয়োজনীয় বিস্তৃত সমর্থন তিনি এখনো অর্জন করতে পারেননি। নিউইয়র্ক সিটি ঐতিহাসিকভাবেই ডেমোক্র্যাটিক ঘাঁটি, তাই রিপাবলিকান প্রার্থীদের জেতার সুযোগ এখানে প্রায় প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে।

এবারের নির্বাচনে সমর্থন বা অনুমোদনের প্রশ্নটি বড় ভূমিকা রাখছে। রাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হকুল প্রকাশ্যে জোহরান মামদানিকে সমর্থন জানিয়েছেন। এটি তার জন্য বড় রাজনৈতিক প্রাপ্তি, কারণ রাজ্যের সর্বোচ্চ নির্বাহী থেকে এ ধরনের সমর্থন ডেমোক্র্যাটিক ঘাঁটিকে আরও শক্ত করবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মামদানিকে “লিটল কমিউনিস্ট” বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং হকুলের সমর্থনকে “শকিং” ও “খুব খারাপ” মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন যে ওয়াশিংটন থেকে এ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নিউইয়র্ক সিটির জন্য ফেডারেল সরকারের বরাদ্দ সীমিত করারও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক কারণে কেন্ত্রীয় বরাদ্ধ ও সুযোগ সুবিধা সংকুচিত হলে, তা সিটির নাগরিকদের কাছে – এমনকি আমেরিকার নাগরিকদের কাছেও কোন ভালো বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে না।

নিউইয়র্ক সিটির রিপাবলিকান ভোটাররা সাধারণত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর জোর দেন। তাদের মতে, শহরের পুনর্গঠন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য কঠোর আইনশৃঙ্খলা এবং কর হ্রাস প্রয়োজন। মামদানির মতো প্রগতিশীল প্রার্থীদের নীতি তাদের কাছে বিপরীতমুখী মনে হয়, কারণ তা ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে তারা মনে করেন। তবে স্লিওয়ার দুর্বল অবস্থান তাদের প্রত্যাশা সীমিত করে রেখেছে।

সব মিলিয়ে, নিউইয়র্ক সিটির ২০২৫ সালের মেয়র নির্বাচন এক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে তরুণ প্রজন্মের প্রিয় প্রগতিশীল নেতা মামদানি, অন্যদিকে পুরনো দুই অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ অ্যাডামস ও কুয়োমো, আর রিপাবলিকান প্রার্থী স্লিওয়া—এই চার প্রার্থীর প্রতিযোগিতা শহরের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে। শেষ পর্যন্ত কে বিজয়ী হবেন তা সময়ই বলে দেবে, তবে এ নির্বাচনের ফলাফল শুধু নিউইয়র্ক নয়, সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় প্রভাব ফেলবে।