রিয়াদ, সৌদি আরব — ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী রোববার দক্ষিণ সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যেই একের পর এক হামলার কারণে দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি নিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী অন্তত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সতর্কবার্তাও জারি করা হয়।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সংঘাত সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও তীব্র হয়েছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর নতুন করে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা বাড়ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের এক বাসিন্দা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, রোববার সকাল থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণ ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, বিস্ফোরণে আশপাশের এলাকা কেঁপে উঠছিল।
বারবার হামলার পর দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রোববার থেকে ফ্লাইট পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছে। তবে বিমানবন্দরটি কতটা স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হবে, তা স্পষ্ট নয়। চলতি মাসে বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে চালানো একটি হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সতর্ক করে বলেছেন, রিয়াদের বিমানবন্দর এখনো নিরাপদ নয় এবং তাদের বাহিনীর কাছে এটি একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু।
এক বিবৃতিতে তিনি আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ বিমান সংস্থার পাশাপাশি বিমানবন্দরের কর্মী ও যাত্রীদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার না করার আহ্বান জানান। বিমানবন্দরটিতে কার্যক্রম পরিচালনার পরিণতির দায় সৌদি কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। বিমানবন্দরে ফ্লাইট পুনরায় চালুর প্রস্তুতির মধ্যেই এই সতর্কবার্তা বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রোববার ভোরে রিয়াদে এএফপির সাংবাদিকেরা তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। একই সময়ে বাসিন্দাদের কাছে সম্ভাব্য আকাশপথের হামলার সতর্কবার্তা পাঠানো হয় এবং নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদের দিকে নিক্ষেপ করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং রাজধানী অঞ্চলে দুটি ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে।
পরে জোট জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে নিক্ষেপ করা একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়েছে। এ ছাড়া আভা, তায়েফ, নামাস ও জাজানসহ বিভিন্ন এলাকায় সতর্কবার্তা জারি করা হয়। এতে দেশটির একাধিক অঞ্চলে হামলার আশঙ্কা দেখা দেয়।
হুথিরা দাবি করেছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তারা সৌদি আরবের তিনটি বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা, একটি পাইপলাইন এবং একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে এসব দাবির সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর মক্কা ও মদিনা অঞ্চলে পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের ঘটনায় তারা সাড়া দিয়েছে। তবে ইসলাম ধর্মের পবিত্রতম দুই শহরকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুথিরা। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবিকে তারা মিথ্যা বলে অভিহিত করেছে। সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে হামলার প্রকৃত লক্ষ্য ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সৌদি আরবের পাশাপাশি ইয়েমেনেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। হুথিরা জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনেও হামলা চালিয়েছে। শহরটি সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের অস্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র।হুথিদের দাবি, এডেনে সৌদি বাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকা একটি নৌঘাঁটি ও সামরিক শিবির তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল।
গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পর অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধির ফলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবে জ্বালানি স্থাপনা ও পরিবহন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার কারণে তেল সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সম্ভাব্য বিঘ্ন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।বারবার হামলার প্রভাব পড়ছে বিমান সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ওপর। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পর্যটন সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতি বহুমুখী করার সৌদি পরিকল্পনাও চাপের মুখে পড়ছে।
রিয়াদের বিমানবন্দর সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি নিলেও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। হামলার মাত্রা, আকাশ প্রতিরক্ষার কার্যকারিতা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় কি না।