মুজিবুর রহমান, ঢাকা — নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) জানিয়েছেন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের পর গ্রিড-সংযুক্ত প্রকল্পটির দরপত্রের নথি প্রস্তুত করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হবে এবং ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট-পিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে আট ঘণ্টার ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।
বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিলের অর্থায়নে সুদের হার হবে ২ শতাংশ। ঋণ পরিশোধের জন্য এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ১৬ বছর সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা।
প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বিদ্যুতের সম্ভাব্য ট্যারিফ প্রতি ইউনিট ৬.১৮ টাকা হতে পারে। এটি ফেনীর সোনাগাজীতে প্রস্তাবিত ২২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ৮.৮৭ টাকা প্রতি ইউনিটের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছাড়া প্রাথমিক প্রস্তাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট প্রায় ৬ টাকা ধরা হয়েছিল। তবে প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় ও ট্যারিফ নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থায়ন, পরিচালন ব্যয় এবং দরপত্রের শর্তের ওপর।
বিপিডিবি ২০১২ সালে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য মোট প্রায় ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে। জমিটি দুটি ব্লকে ভাগ করা হয়েছিল। ব্লক-এ-এর আয়তন ৯১৫.৫০ একর এবং ব্লক-বি-এর আয়তন ৯১৮.৫০ একর।
বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেডের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্লক-এ-তে নির্মিত হয়েছে। ব্লক-বি বিপিডিবির অধীনে রয়েছে এবং সেখানে প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্ধারিত জমি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহারের উদ্যোগকে দেশের জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তনের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকল্পটির বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে নতুন ২৩০ কিলোভোল্ট সঞ্চালন ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে। এটি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির নিকটবর্তী একটি সাবস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। কেন্দ্রটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা যুক্ত হবে। তবে প্রকৃত উৎপাদন আবহাওয়া, যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
প্রকল্পটি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ওপর পরিবেশগত চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এর প্রকৃত পরিবেশগত সুফল নির্ভর করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং এর মাধ্যমে কতটা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিস্থাপিত হয় তার ওপর।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত জমিকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে রূপান্তর করা বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল জ্বালানি অগ্রাধিকারের প্রতিফলন।
তাঁর মতে, আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রকল্পটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে এবং আরও পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বিদ্যুৎ খাত গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে, সরকার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উদ্যোক্তা ও সেবাদাতাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য দেশব্যাপী কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। রামপালের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি সেই লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশের মোট গ্রিড-সংযুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ১৪৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের অবদান ১ হাজার ৬৪২.৭ মেগাওয়াট।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রকল্পটি অননুমোদিত প্রকল্প হিসেবে ‘গ্রিন পেজ’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি সরকারের পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামোর পাশাপাশি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৭-এর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই লক্ষ্যের উদ্দেশ্য হলো সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হবে সৌর ফটোভোলটাইক মডিউল ও স্থাপন কাঠামোতে। এ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক। ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার এবং সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা অ্যাকুইজিশন (SCADA) ব্যবস্থাসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৩২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রকল্পের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটিকে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে।
দরপত্র প্রস্তুতের কাজ শেষ হলে পরবর্তী ধাপে ঠিকাদার নির্বাচন ও নির্মাণকাজ শুরু হবে। নির্ধারিত সময়সূচি বজায় থাকলে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে রামপাল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।