যুক্তরাজ্যের আইন সংস্থার চ্যালেঞ্জ: শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব সংবাদদাতা: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় ও বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে লন্ডনভিত্তিক একটি খ্যাতনামা আইন সংস্থা। সংস্থাটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যে বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য নয়।

তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চ, যার নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি গোলাম মোর্তুজা মজুমদার, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে সহিংস দমন-পীড়নের ঘটনায় শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল সহিংসতা উসকে দেওয়া, হত্যার নির্দেশ দেওয়া এবং নৃশংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতা। শেখ হাসিনার পক্ষে দাখিল করা ১০ পৃষ্ঠার এক চিঠিতে আইন সংস্থাটি বলেছে, বিচারটি “আন্তর্জাতিক ন্যায্যতা ও প্রক্রিয়াগত অধিকারসমূহের মৌলিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক”।

আইন সংস্থাটি দাবি করেছে, মামলাটি একটি “বিরূপ ও বৈরী পরিবেশে” পরিচালিত হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং আইনজীবী দলের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, “শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে।” একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করে দেয়, এই আপত্তি বর্তমান বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা স্বীকার করে না।

আইন সংস্থাটি বিচারকদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের অক্টোবরে পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এমন বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিশেষভাবে বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলা হয়, হাইকোর্টে নিয়োগ পাওয়ার মাত্র ছয় দিনের মাথায় তাকে ট্রাইব্যুনালে যুক্ত করা হয় এবং তিনি আগেই শেখ হাসিনার দোষ নির্ধারণ করে রেখেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

এছাড়া, ২০২৫ সালের আগস্টের এক আদালত মন্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, তিনি রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীকে বলেছিলেন—“আপনারা চেষ্টা করবেন আসামিদের ফাঁসি থেকে বাঁচাতে”—যা রায় পূর্বনির্ধারিত ছিল এমন ইঙ্গিত দেয় বলে দাবি করা হয়েছে। প্রাক্তন প্রধান কৌঁসুলি মো. তাজুল ইসলামের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে আইন সংস্থাটি। তাদের দাবি, তিনি আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন এবং বিচার চলাকালে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন।

এছাড়া ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে সংশোধনের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বাইরে গিয়ে সাম্প্রতিক আন্দোলনের ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য। তাদের মতে, এ ধরনের মামলা সাধারণ ফৌজদারি আদালতেই বিচার হওয়া উচিত। ত্রুটিপূর্ণ বিচারপ্রক্রিয়ার ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আন্তর্জাতিক আইনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

সংস্থাটি রায়টিকে অবিলম্বে বাতিলযোগ্য ও আইনগতভাবে অকার্যকর ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে এবং ১৪ দিনের মধ্যে জবাব চেয়েছে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দ্বারস্থ হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিচারকে ২০২৪ সালের সহিংস ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেছে।