ঘরে ফেরা হলো না নিশাতের: কুইন্সে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল ১৯ বছরের তরুণীর

নিউইয়র্ক, কুইন্স: গভীর রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন ১৯ বছর বয়সী নিশাত জান্নাত। ঘটনাটি ঘটেছে কুইন্সের উডসাইডে, রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ ও ৬২ স্ট্রিটের মোড়ে।পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রোববার রাত প্রায় ১২টার দিকে নিশাত একটি কেক হাতে ক্রসওয়াক দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় পশ্চিমমুখী রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ ধরে আসা রয়্যাল ওয়েস্ট সার্ভিসেসের একটি গারবেজ ট্রাক ডান দিকে মোড় নিতে গিয়ে তাকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ঘটনাস্থলেই ইএমএস কর্মীরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের বাসা ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ১০ মিনিটের হাঁটা পথ দূরে, ৫৫তম স্ট্রিটে।

সেই রাতে বাড়িতে বড় বোন নওশিন জান্নাত (২১) ছোট বোনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রাত বাড়তে থাকলেও নিশাতের কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে রাত প্রায় ২টার দিকে নিশাতের মোবাইলের লোকেশন ট্র্যাক করে ঘটনাস্থলে পৌঁছান নওশিন ও পরিবারের সদস্যরা। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান চারদিকে পুলিশের উপস্থিতি এবং নিশাতের নিথর দেহ। মুহূর্তেই পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। নিশাতের চাচা জামাল আহমেদ শিমু জানান, “ঘরের ভেতর এখন শুধু কান্না। বাবা-মা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। কিছুই আর আগের মতো নেই।”

নিশাত জান্নাত জ্যামাইকার পারসন্স বুলেভার্ডে একটি পার্কিং গ্যারেজে পার্ট-টাইম রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও কাজ শেষে রাত ১১টার দিকে ট্রেনে করে উডসাইডে নামেন। বাড়ি ফেরার আগে ছোট বোনের জন্য একটি কেক কেনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরিবারের ভাষ্যমতে, সেই ছোট্ট ভালোবাসার ইচ্ছাই তার জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়।

বড় বোন নওশিন জান্নাত কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “নিশাত সবসময় বলত—আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। বর্তমানেই বাঁচো, এই মুহূর্তের জন্য বাঁচো। সে কখনো ভাবেনি তার সময় এত কম।” নিশাত ছিলেন চার বোনের একজন। পরিবারের দুই ছোট সদস্যের বয়স যথাক্রমে ৯ ও ৪ বছর। যে ছোট বোনের জন্য কেক আনতে গিয়েছিলেন, সে আজ আর তার দিদিকে ফিরে পাবে না।

নিশাতের বাবা হেলাল আহমদ উডসাইডের বায়তুল জান্নাহ মসজিদের ইমাম। ২০১৭ সালে পরিবারটি অভিবাসী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তাদের গ্রামের বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার রায়গড়ে। পরিবারটি যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল। সেই স্বপ্নের এক উজ্জ্বল অংশ ছিলেন নিশাত।

নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের হাইওয়ে ডিস্ট্রিক্টের কলিশন ইনভেস্টিগেশন স্কোয়াড ঘটনাটি তদন্ত করছে। ট্রাকটির ৩৮ বছর বয়সী নারী চালক ঘটনাস্থলেই ছিলেন এবং সামান্য আঘাতের জন্য চিকিৎসা নেন। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। রয়্যাল ওয়েস্ট সার্ভিসেসের মূল প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট কানেকশনস এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছে, তারা তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। উডসাইড ও জ্যাকসন হাইটসের বাসিন্দারা পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে অনেকেই প্রাইভেট গারবেজ ট্রাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার জোহরের নামাজের পর উডসাইডের বায়তুল জান্নাহ মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে তাকে নিউজার্সির একটি মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হবে।