শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক — বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর বহাল নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে জরুরি আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার ব্রিটিশ আইনজীবীদের প্রতিষ্ঠান ম্যাট্রিক্স চেম্বার্সের প্রকাশিত এক ঘোষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ঘোষণা অনুযায়ী, শেখ হাসিনার পক্ষে ব্যারিস্টার স্টিভেন পাওলস কেসি (Steven Powles KC) এই আবেদন দাখিল করেছেন। এতে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সাবেক ক্ষমতাসীন দলকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বাদ দেওয়া মৌলিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং জনসাধারণের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগকে ক্ষুণ্ন করে।
ম্যাট্রিক্স চেম্বার্সের তথ্য অনুযায়ী, আবেদনে এসব বিধিনিষেধের বৈধতা ও আনুপাতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনী রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (International Covenant on Civil and Political Rights—ICCPR) বিভিন্ন বিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং জনসাধারণের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার। আবেদনে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ এসব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকার লঙ্ঘন করছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
জাতিসংঘের তিনজন মানবাধিকারবিষয়ক ম্যান্ডেটধারীর কাছে আবেদনটি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ম্যাট্রিক্স চেম্বার্স। তাঁরা হলেন সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রসারের বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক এবং গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রসারের বিষয়ক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ।
আবেদনে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের উত্থাপিত অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি বড় রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার রাজনৈতিক প্রভাব এবং দলটির সমর্থকদের মৌলিক অধিকার চর্চার সুযোগ নিয়েও আবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ১২ মে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার কথা জানানো হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞার আওতায় দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে রয়েছে।
সাবেক সরকারের আমলে সংঘটিত কথিত অপরাধের জবাবদিহি, রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি আচরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই এই আবেদন করা হয়েছে। শেখ হাসিনার পক্ষে দাখিল করা আবেদনে মানবাধিকারের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করা হলেও, এতে উত্থাপিত অভিযোগ ও আইনি যুক্তিগুলোকে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারেন, তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন এবং প্রকাশ্য বিবৃতি দিতে পারেন। তবে তাঁরা সরাসরি কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ আইন বাতিল করতে বা বাংলাদেশ সরকারকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পুনরায় চালুর নির্দেশ দিতে পারেন না।
ফলে এই আবেদনকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার নজরে আনার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ম্যাট্রিক্স চেম্বার্সের প্রকাশিত ঘোষণায় এই নির্দিষ্ট আবেদনের বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
এই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।