শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক — অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও ব্যাপক উচ্ছেদ কার্যক্রম নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। তাঁর মতে, ইসরায়েলের এ অভিযান ঘিরে জাতিগত নিধনের গুরুতর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে ৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
তুর্ক সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, ইসরায়েলের এই ‘আক্রমণাত্মক অভিযান’-এ আবাসিক বাড়িঘর ও বাণিজ্যিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাধীনভাবে চলাচলের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাপক পরিসরে নেওয়া এসব পদক্ষেপ অপ্রয়োজনীয় ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগের গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে। এ ধরনের পদক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
ওসিএইচএ জানিয়েছে, জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা অংশীদারেরা বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর প্রয়োজন মেটাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করছে। গত শুক্রবার হেবরনের কাছে একটি ইসরায়েলি সামরিক চেকপোস্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং আরও তিনজন আহত হন। দুই হামলাকারীও নিহত হন। ওই ঘটনার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পশ্চিম তীরে কঠোর নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ এবং হেবরনে ব্যাপক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন।
তুর্ক বলেন, ইসরায়েলের অবরোধের কারণে অনেক ফিলিস্তিনি নিজেদের বাড়ি কিংবা আশপাশের এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। ইসরায়েলি সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে এসব পদক্ষেপের শাস্তিমূলক উদ্দেশ্য এবং মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টির প্রচেষ্টার ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
বাস্তুচ্যুত সব ফিলিস্তিনিকে তাঁদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের এই মানবাধিকারপ্রধান। পাশাপাশি বেআইনি উচ্ছেদ, বাড়িঘর ধ্বংস এবং এর ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতির জন্য ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তুর্ক সতর্ক করে বলেন, সমষ্টিগত শাস্তি আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। পুরো আবাসিক এলাকা খালি করে দেওয়া বা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকিও জাতিগত নিধনের গুরুতর আশঙ্কা তৈরি করে।
এদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। সপ্তাহান্তেও এসব হামলার কারণে ফিলিস্তিনিদের জলপাই সংগ্রহ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ওসিএইচএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের দুই হাজারের বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেগুলোতে হতাহত কিংবা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জাতিসংঘের সংস্থাটি বলছে, কোনো এক বছরে নথিভুক্ত হামলার তুলনায় এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। গাজা ও পশ্চিম তীর—দুই অঞ্চলেই নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তায় জাতিসংঘ ও এর অংশীদারেরা কাজ করছে।
গাজায় তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-সংলগ্ন এলাকায় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের খবর জানিয়েছে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো। ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইসরায়েলি বাহিনী যে রেখা পর্যন্ত পিছু হটেছিল, সেটিকে ‘ইয়েলো লাইন’ বলা হচ্ছে। ওসিএইচএ জানিয়েছে, সম্প্রতি গাজার আশ শুজাইয়া এলাকা এবং দেইর আল-বালাহর কিছু অংশে নতুন হলুদ চিহ্নযুক্ত ব্লক দেখা গেছে।
শুক্রবার থেকে দেইর আল-বালাহতে জাতিসংঘের একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের তিনটি স্কুলের আশপাশে এবং একটি জাতিসংঘের ত্রাণবাহী বহরের কাছে পৃথক তিনটি গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। গাজার আশ শুজাইয়া এলাকায় জাতিসংঘের একটি দল পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পায়, রোববার রাতে অস্থায়ী তাঁবুতে আগুন লাগানোর ঘটনায় অন্তত নয়টি পরিবারের আশ্রয়স্থল পুড়ে গেছে। এর আগের সপ্তাহে একই স্থানে আরেকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় ২০০ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
সোমবার প্রকাশিত পৃথক এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে এবং গাজায় গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। কমিশনের প্রতিবেদনে উচ্ছেদ, নিপীড়ন, নির্যাতন, ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতাসহ বিভিন্ন অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড—পূর্ব জেরুজালেমসহ—এবং ইসরায়েলসংক্রান্ত তদন্তের অংশ।
কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরালিধর বলেন, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের হত্যা ও আহত হওয়া, বাড়িঘর ধ্বংস এবং দায় অস্বীকারের প্রবণতা ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তিনি আরও বলেন, গাজায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের ফলে ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে যাওয়া বা তা অতিক্রম করা ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
তদন্ত কমিশনের দাবি, যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও গাজায় গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। তবে ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। জেনেভায় ইসরায়েলের স্থায়ী মিশন প্রতিবেদনটিকে দেশটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা বলে বর্ণনা করেছে।
হেবরনে বাস্তুচ্যুতি, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং গাজায় মানবিক সংকট—সব মিলিয়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।