শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক — অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধি এবং ইসরায়েলের ব্যাপক চলাচল নিষেধাজ্ঞা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। হেবরনের কাছে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার পর অঞ্চলটি কার্যত অবরুদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে ইসরায়েল। এতে ফিলিস্তিনিদের চলাচল, জীবিকা ও মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার হেবরন শহরের বাইরে একটি সামরিক চেকপোস্টের কাছে বন্দুকধারীদের গুলিতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং অন্তত পাঁচজন আহত হন। পাল্টা সংঘর্ষে দুই ফিলিস্তিনি হামলাকারীও নিহত হন। ঘটনার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হেবরন অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি তল্লাশি ও ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযানের হুমকির কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এক মাসের মধ্যে এটি চতুর্থবার, যখন ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ব্যাপক চলাচল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক জানান, হেবরনে অবরোধ, বাড়িঘর ধ্বংস এবং সম্ভাব্য বাস্তুচ্যুতি নিয়ে মহাসচিব গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দুজারিক বলেন, এসব নিষেধাজ্ঞা ফিলিস্তিনিদের চলাচলের স্বাধীনতা, মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ এবং জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের রেকর্ডসংখ্যক হামলার নিন্দা জানিয়েছেন গুতেরেস। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দখলদার শক্তি হিসেবে ফিলিস্তিনি জনগণকে এ ধরনের হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা ইসরায়েলের দায়িত্ব।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মুখপাত্র মায় এল শেখ বলেন, এ ধরনের অবরোধ ফিলিস্তিনিদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের হাতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বা সেনারা সহিংসতার শিকার হলে তার প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক অবরোধ, অভিযান ও নির্বিচার আটকের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার একটি ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। শুক্রবারের হামলার পর হেবরনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ইব্রাহিমি মসজিদ বন্ধ থাকায় মুসল্লিরা জুমার নামাজ আদায় করতে পারেননি বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে।
অবরোধের সময়টি ফিলিস্তিনিদের বার্ষিক জলপাই সংগ্রহ মৌসুমের সঙ্গে মিলে গেছে। চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে হাজারো ফিলিস্তিনি কৃষক তাঁদের জলপাইবাগানে পৌঁছাতে পারছেন না। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, অক্টোবরের প্রথম দুই সপ্তাহেই বসতি স্থাপনকারীদের ১৬০টিরও বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, ফসল চুরি এবং জলপাইবাগানের ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ঘটেছে।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকদের লক্ষ্য করে হামলার খবর পাওয়া গেছে। রামাল্লার কাছে জলপাই সংগ্রহের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় এক সপ্তাহ আগে মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ওয়াশিংটন পোস্টের একজন আলোকচিত্রী গুরুতর আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে গাজায় শিশুদের মৃত্যুসহ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং শীতের আগে মানবিক সহায়তা প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গুতেরেস। তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, সংযম প্রদর্শন এবং উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে—এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের সতর্কবার্তায় অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার জরুরি প্রয়োজন আবারও সামনে এসেছে।