মেডিকেইড জালিয়াতির অভিযোগে ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত : কম্পিউটার ও নথিপত্র জব্দ

নিউইয়র্ক: যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে মেডিকেইড জালিয়াতির সন্দেহে ১০০টির বেশি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার (Social Adult Day Care) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ। গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার কুইন্স, ব্রুকলিন ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ডসহ নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন এলাকায় একযোগে অভিযান চালানো হয়। অভিযানের সময় তদন্তকারীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বাক্সভর্তি নথিপত্র, কম্পিউটার ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যেতে দেখা যায়। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোচুলের কার্যালয় জানিয়েছে, কয়েক মাস ধরে চলা তদন্তের অংশ হিসেবে এই সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

কুইন্সের ফ্লাশিং এলাকায় অবস্থিত হাম্মুম ডেকেয়ারে অভিযানের সময় এজেন্টদের প্রায় ছয়টি বাক্স, দুটি কম্পিউটার এবং একটি বড় প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা সামগ্রী নিয়ে যেতে দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানটির বাইরে কার্যক্রম স্থগিত রাখার একটি নোটিশও দেখা গিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত কোরীয়-আমেরিকান ও এশীয়-আমেরিকান বয়স্কদের জন্য সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেবা দেওয়ার কথা প্রচার করে। তবে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগের বিস্তারিত কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি।

ব্রুকলিনের সানসেট পার্ক ও বরো পার্ক এলাকাতেও অভিযান পরিচালিত হয়। সানসেট পার্কের এইট অ্যাভিনিউ এবং বরো পার্কের ফোর্ট হ্যামিল্টন পার্কওয়ের একটি ডে কেয়ার কেন্দ্রে তদন্তকারীদের তৎপরতা দেখা যায়। স্ট্যাটেন আইল্যান্ডেও একাধিক স্থানে তল্লাশি চালানো হয়। তবে অভিযানের আওতায় থাকা সব প্রতিষ্ঠানের নাম এবং জব্দ করা সামগ্রীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

নিউইয়র্ক স্টেটের স্বাস্থ্য বিভাগ, মেডিকেইড ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয় এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের মেডিকেইড ফ্রড কন্ট্রোল ইউনিটের পাশাপাশি ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (FBI), হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (HSI) এবং অন্যান্য সংস্থা তদন্তে অংশ নিচ্ছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মেডিকেইড কর্মসূচির অর্থের অপব্যবহার, অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্ত করাই এ অভিযানের উদ্দেশ্য।

গভর্নর ক্যাথি হোচুল বলেছেন, তদন্তকারীরা এমন সেবা প্রদানকারীদের লক্ষ্য করছেন, যাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, কিকব্যাক বা অবৈধ কমিশন, অনিয়মিত বিল জমা এবং অন্যান্য জালিয়াতিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, করদাতাদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং যাঁদের প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যসেবা ও সহায়তা প্রয়োজন, তাঁদের জন্য বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর কার্যালয় জানিয়েছে, ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ে কয়েক মাস ধরে এই তদন্ত চলছিল।

এফবিআই এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নিউইয়র্কের সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেবায় মেডিকেইডের প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। তদন্তকারীরা এই বিপুল অর্থের কোনো অংশ জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন। বর্তমানে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে ৪০০টির বেশি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার কর্মসূচি রয়েছে এবং আনুমানিক ৪৫ হাজার মেডিকেইড সদস্য এসব সেবার ওপর নির্ভর করেন। এসব কেন্দ্রে বয়স্কদের দিনের বেলা তত্ত্বাবধান, খাবার, সামাজিক কার্যক্রম এবং কমিউনিটিভিত্তিক সহায়তা দেওয়া হয়।

অভিযানের পর স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের একটি ডে কেয়ার কেন্দ্রের দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে আলাদা করে অভিযোগ আনা হয়েছে। সি ডে কেয়ার সেন্টার (SI Day Care Center) এর মালিক ইয়াংসীম ওম (Yangsim Oum) এবং এর প্রোগ্রাম পরিচালক জুইয়ং চো (Juyoung Choe) কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে এমন সেবার জন্য বিল জমা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী বাস্তবে দেওয়া হয়নি। স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের জেলা অ্যাটর্নির ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগে ৫ লাখ ৩০ হাজার ডলারের বেশি জালিয়াতির কথা বলা হয়েছে। তবে এই অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশি মালিকানাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান এই অভিযানের আওতায় ছিল কি না, সে বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত সূত্রে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনায় নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকেই হোম কেয়ার ও ডে কেয়ার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, বেশ কয়েকটি বাংলাদেশী মালিকানাধীন ডে কেয়ারেও তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছে ।

উল্লেখ্য, সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার এবং হোম কেয়ার এক ধরনের সেবা নয়। সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ারে বয়স্ক ব্যক্তিরা দিনের নির্দিষ্ট সময় কেন্দ্রে তত্ত্বাবধান, খাবার ও সামাজিক কার্যক্রমের সুবিধা পান। অন্যদিকে হোম কেয়ার সেবায় সাধারণত ব্যক্তির নিজ বাড়িতে পরিচর্যা বা দৈনন্দিন কাজে সহায়তা দেওয়া হয়। ২০ অক্টোবরের অভিযানের প্রকাশিত তথ্য মূলত সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই অভিযান চালানো হয়েছে।

নিউইয়র্ক স্টেট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার কর্মসূচির তদারকি আরও জোরদার করার পাশাপাশি এর ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েও পর্যালোচনা চলছে। কর্মসূচিতে সংস্কার, কঠোর নজরদারি এবং প্রয়োজনে সেবাগ্রহীতাদের বিকল্প সহায়তার ব্যবস্থা নিয়ে সুপারিশ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে গভর্নরের কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।