যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি তার বিতর্কিত ‘ভিসা বন্ড’ নীতিতে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘোষণা করেছে, যার ফলে বাংলাদেশিসহ মোট ৩৮টি দেশের নাগরিকদের ভিসা আবেদন করার সময় জামানত অর্থ দিতে হতে পারে। এই নীতি ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। ভিসা বন্ড বা জামানত হলো একধরনের আর্থিক নিশ্চয়তা, যা যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা আবেদন করার সময় জমা দিতে হয়—বিশেষত ব্যবসা (B1) ও পর্যটন/ভ্রমণ (B2) ভিসা। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারীদের ৫,০০০ থেকে ১৫,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত জামানত দিতে হতে পারে। জামানত প্রদানের পরও ভিসা পাওয়া নিশ্চিত নয়, এবং ভিসা না পেলে বা ভিসাধারী নিয়ম মেনে দেশে ফেরত গেলে এই জামানত ফেরতও পাওয়া যায়।
নতুন নীতিতে বর্তমানে মোট ৩৮টি দেশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, বিশেষত আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলো। সম্প্রসারিত তালিকায় আলজেরিয়া, বাংলাদেশ, কিউবা, নেপাল, নাইজেরিয়া, ভেনেজুয়েলা, সিনেগাল, উগান্ডা, ভানুয়াতুসহ বিভিন্ন দেশ রয়েছে।
বাংলাদেশও এই নীতিতে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের নাগরিকেরা যদি যুক্তরাষ্ট্রে B1 বা B2 ভিসার জন্য আবেদন করেন, তাহলে তাঁদেরকে সম্ভাব্য ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার (প্রায় ৫ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১৮ লাখ টাকা) পর্যন্ত জামানত দিতে হতে পারে। জামানত অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম “Pay.gov”-এর মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
এ নীতির আওতায় থাকা অবস্থায় আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়া অন্য কোথাও প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না—এসব হলো বোস্টন লোগান, জন এফ কেনেডি (JFK) ও ওয়াশিংটন ডুলেস । তাদের ফিরে যাওয়ার জন্যও এ তিনটি বিমানবন্দরই ব্যবহার করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলেন, নতুন নীতির উদ্দেশ্য হলো ভিসা মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনিয়মিতভাবে দেশে থেকে যাওয়া (ওভারস্টে) কমানো। এর ফলে একটি আর্থিক বাধা তৈরি হয়ে অনিয়মিত থাকার প্রবণতা কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই নীতির প্রাথমিক রূপ ২০২৫ সালের আগস্টে চালু হলেও এখন তা বহুলাংশে সম্প্রসারিত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির আওতায় ইতোমধ্যেই কঠোর ডিপোর্টেশন, ভিসা ও গ্রিন কার্ড বাতিল, নিরাপত্তা পর্যালোচনা ও বায়োমেট্রিক স্ক্রিনিংসহ নানা পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেগুলো প্রশাসনের ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে এসেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ভিসা বন্ড নীতি ভিসা ওভারস্টে হ্রাসে সহায়ক হবে এবং অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত করবে। তাদের মতে এটি আবেদনকারীদের মধ্যে নিয়ম মেনে চলার মনোভাব তৈরি করবে।
তবে সমালোচনার মাত্রা কম নয়। বিশেষত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী, পর্যটন ব্যবসায়ী ও নীতি বিশ্লেষকরা এটিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অসমতা সৃষ্টি করা মনে করছেন। তাদের যুক্তি, এই জামানত অর্থ উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য একটি বড় আর্থিক বোঝা, যেখানে গড় মাসিক আয় কম—এর ফলে এমন উচ্চ জামানত সামাজিকভাবে নানা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
এ ছাড়াও পর্যটন বা ব্যবসায়ের ভিসাও এর কারণে অকৃষ্ণ হয়ে পড়তে পারে, কারণ বহু ভ্রমণকারী বা উদ্যোক্তা এই অপরিবর্তিত অর্থভার বহন করতে পারেন না। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড নীতি বাংলাদেশিসহ বহু দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রক্রিয়ায় নতুন আর্থিক চাপ ও জটিলতা তৈরি করেছে। এটি কেবল একটি ভিসা আবেদন শর্ত নয়, বরং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, ব্যবসা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় একটা বাধা হয়ে উঠছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় নীতিটি কোন পরিমাণে ফলপ্রসূ হবে, তা সময়ের সঙ্গে বিচার্য; তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকের কাছে এটি অর্থনৈতিকভাবে কঠিন ও বিতর্কিত বলে অভিহিত হচ্ছে।